জুতা বাবুল

ঢাকা, বুধবার, ২৫ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জুতা বাবুল

অপু চৌধুরী ৭:১৩ অপরাহ্ণ, মে ১১, ২০২০

print
জুতা বাবুল

ছেঁড়া বাবুল নামটি এলাকায় খুবই পরিচিত, একদিন মামার বাসা থেকে কী যেন চুরি করে পালানোর সময় মামি তাকে ঝাপটে ধরলে শার্টের কিছু অংশ ছিঁড়ে মামির হাতে থেকে যায়। এই দৃশ্য এলাকার অনেকেই দেখে ফেলে, সেই থেকে তার ‘ছেঁড়া বাবুল’ নামটি পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। সে এখন অনেক বড় হয়েছে, আয় বেড়েছে, দান খয়রাতও করে তাই নামটি পাল্টাতে চায়। সে চায় সকলে তাকে দানি বাবুল বলেই ডাকুক। কিন্তু চুরি পেশা পরিবর্তন করে নয় কারণ সে বুঝে এ পেশা কৌশলে করতে পারলে যাদের চুরি যায় তাদের মুখ থেকেই বেশি সুনাম পাওয়া যায়।

বাবুলের বাড়ির অদূরে রাস্তার ধারে প্রায়ই ২০/২৫ জন ভিখারি থালা নিয়ে বসে ভিক্ষা করে, তারা বাবুলকে চেনে কারণ সেও মাঝে মাঝে তাদের ভিক্ষা দেয়। সেদিন কোট-স্যুট পরে প্রত্যেককে নিজ হাতে ৩ টাকা করে ভিক্ষা দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের থালাতে একটা করে নতুন ৫ টাকার নোট দিয়ে ফের ২ টাকা করে ফেরত নিচ্ছিল আর তা এমন কৌশলে করছিল যে কোনো ভিখারিই বুঝতে পারছিল না যে তাদের কাছ থেকে ৭ টাকা করে কয়েন নিয়ে নিচ্ছিল। বুঝবেও বা কেমনে! তাদের থালাতে যে নতুন কাগজের টাকার নোট! আবার সবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে, তোমাদের জন্য বন রুটি আর পানি নিয়ে আসছি, খেয়ে আমার জন্য দোয়া করো, আমার নাম ধরে সেøাগান তুলে বলোÑ

বাবুল ভাই দানি
বাবুল ভাই মানি।

অমনি পাশের দোকান থেকে প্রত্যেকের জন্যে বনরুটি আর পানি এনে খেতে দিল। সবাই খুশিতে তার কথামত সেøাগান দেয়। উৎসুক জনতা তার এ দৃশ্য ফটো তুলে, ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট দিলে ভাইরাল হয়। এই সংবাদ চলে যায় মামির কাছে, দীর্ঘ ১০ বছর পর চোর ভাগিনার এমন কীর্তি দেখে গর্ব বোধ করে। ভাগিনার মোবাইল ফোনে মেসেজ দেয়, বাসায় আসতে। বাবুল মনে মনে খুশি হয়, ফন্দি আঁটে অন্যরকম।

ছেঁড়া বাবুল প্রতি মাসে ঢাকায় যায়, জুতোর ব্যবসা করে। ঢাকা থেকে নতুন পুরাতন জুতো এনে নিজের এলাকায় বিক্রি করে। এক্কেবারে কাঁচা পয়সা। আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া সব মিলিয়ে হাজার খানেক টাকাই তার পুরো মাসের ব্যবসার পুঁজি। অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই, এটাই ঠিক, কেননা সে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থান থেকে চুরি করা জুতাই এলাকায় এনে বিক্রি করে। তাই এখন অনেকে তাকে জুতা বাবুলও ডাকে, এতে তার আশা জাগে সে ভাবতে থাকে মানুষ কীভাবে কখন থেকে তাকে দানি বাবুল বলে ডাকবে! ঢাকায় জুতো চুরিকালে দুই একবার ধরা খেয়ে উত্তমমধ্যম খেলেও নিজ এলাকায় সে খুব শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করতে থাকে, ইয়াং পোলাপানদের জন্য টাকা খরচ করে। ছোট ছোট সমাবেশ করে বক্তব্য রাখে, মুরব্বি দেখলে পা ধরে সালাম করে, জোর করে চা-নাস্তা খাওয়ায়। দুই দুইটা বড় বড় মোবাইল রাখে হাতে, সবকিছুরই ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। প্রচুর উৎসাহমূলক লাইক-কমেন্ট দেখে নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করে। এখন অগণিত ফলোয়ার তার।

একদিন সন্ধ্যায় মামির কাছে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় অনেক নাস্তাপানি, ফলমূল। চুরি করে আনা এক জোড়া ভালো জুতা তার মাথায় করে নেয়। মামি পটানোর অনেক কৌশলী প্রস্তাব। অনেকদিন পর ভাগ্নেকে দেখে মামির কী এক অনুভূতি! অনেক গল্প-আলাপের ফাঁকে মামিকে প্রস্তাব করে, ‘মামি, তুঁই আঁরে অন্ ত্তুন এমপি বাবুল নামে ডাইকবা। তোঁয়ার ভাইগনা অন্ আর চুরি করে না, বউত ট্যাঁয়া কামাই করে, দান খয়রাত করে। তুঁই জানো না যারা এগিন করে তারা রে হগলে এমপি কয়?’
মামি বলে, ‘ঠিক আছে। আঁই তোরে এমপি ডাইক্যুম।’

‘আহ্ হা মামি! তুই করি কইও না, তুঁই করি কইও, সামনে তোঁয়ার লগে বউত কাম আছে।’
‘কী কাম ক’ছেনা ভাইগনা!’

‘সামনের হপ্তায় বাজারে জনসমাবেশ অইব, ইয়ানে তুঁই অইবা প্রধান অতিথি, আঁর পাশে বইসবা, আঁর সুনাম কই কই মাইকে বক্তব্য দিবা। এন ভাবে কইবা যেন বেয়াক মাইনষ্যে তালি মারে। পেপারত তোঁয়ার ছবি উইঠবো। ফেইসবুক খুলি ছবি পোস্ট দিবা। কত্ত মাইনষ্যে লাইক দিবো কমেন্ট কইরবো!’ মামি মনে মনে খুব খুশি হয়, মাথা নেড়ে সায় দেয় আর ভাবে সেও অনেক বড় কিছু হবে। ফেসবুক, পেপারে ছবি ছাপলে এলাকার লোকজন তাকে সম্মান করবে, ভয় পাবে... ইত্যাদি।

এরই মধ্যে শুরু হল করোনাকাল, চারদিকে লকডাউন, কোয়ারান্টিন, ত্রাণ বিতরণ, দূরে থেকে মানুষের প্রতি মানুষের সেবা ইত্যাদি। ছেঁড়া বাবুল মনে মনে ফন্দি আঁটে এ সময়কে কাজে লাগিয়ে নামী লোক বনে যাওয়ার। মামির সঙ্গে আলাপ করে মামার বাড়ির সামনে করোনা বিধি অনুসারে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করবে। প্রচার হলো পুরো এলাকায় আগামীকাল সকালবেলা আনু মিয়ার (বাবুলের মামা) বাড়িতে এমপি বাবুলের নেতৃত্বে গ্রামবাসীদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। সেমতে খুব ভোর থেকেই বাবুল মামিকে নিয়ে মঞ্চে, সামনে আছে ১০টি চালের ড্রাম কিন্তু খালি। ব্যানার সাঁটা আছেÑ ‘এমপি বাবুলের সালাম নিন’। নিচে লেখাÑ সার্বিক সহযোগিতায় : কলি বেগম। কলি বেগম মানে মামি। এলাকার অনেক লোক ত্রাণ নিতে নিয়মানুসারে লাইনে দাঁড়িয়ে। ত্রাণ বিতরণ শুরু হলে আগে থেকে তৈরি ইয়াং পোলাপান সেøাগান দিতে

শুরু করে
এমপি বাবুল হলে জয়
এলাকাবসীর কীসের ভয়!

ঘ্যাচাং ঘ্যাচাং ছবি উঠতে থাকে শত শত। কী যে আনন্দ ছেঁড়া বাবুল আর মামির! ৭/৮ জনকে ত্রাণের থলে দেওয়া হলেই বাবুল হাত জোড় করে সকলের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, ‘দুর্ভাগ্য, আজকের মত ত্রাণ বিতরণ এখানেই শেষ করতে হবে, অনেক আগ থেকে বিতরণ শুরু করায় আমাদের সকল সামগ্রী শেষের পথে, আগামীতে আবার হবে এবং জানিয়ে দেওয়া হবে। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন, আমি সবসময় আপনাদের সুখে-দুঃখে আছি, থাকব।’

কেউ বাবুলের চালাকি বুঝতে পারেনি। মনে মনে রাগ হলেও মুখ খুলে কেউ কিছু না বলে যে যার মত করে চলে গেল। তার আগেই বাবুলের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট হয়ে গেছে শ’খানেক ছবি, ক্যাপশন ছিল এমপি বাবুলের নেতৃত্বে, কলি বেগমের সহযোগিতায় এক হাজার এলাকাবাসীকে ত্রাণ বিতরণ। লাইক আর কমেন্ট আসছে ঝড়ের মত। ক্যামেরাসহ সাংবাদিক উপস্থিত মামি-ভাগ্নে সাক্ষাৎকার নিতে। কী যে মজা! আগামীকাল পত্রিকায় ছবিসহ রিপোর্ট হবে, নামও পাল্টে যাবে।

এরই মধ্যে বাবুল জানতে পারল দেশে ধান কাটার মজুর পাওয়া যাচ্ছে না। দুষ্টবুদ্ধিসম্পন্ন ছেঁড়া বাবুল দেরি না করে মামি ও তার দলবলসহ কাস্তে নিয়ে নেমে পড়ে কাঁচা ধানের মাঠে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে প্রায় সব কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে দেয়। মোবাইল ফোনে ছবি তুলে পোস্ট দেয়, ‘বিনা পারিশ্রমিকে জনদরদি এমপি বাবুলের ইরি ধান কর্তন কর্মসূচি।’ চতুর্দিক থেকে বাবুলের কাছে ফোন কল আসতে থাকে ধান কাটার মজুর পাঠানোর জন্য। এদিকে অন্যের জমি থেকে কাঁচা ধান কাটার অপরাধে ছেঁড়া বাবুলকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ। পরের দিন পত্রিকায় ছাপা হয়, জুতা বাবুল গ্রেফতার!