মুদ্রাদোষ

ঢাকা, শনিবার, ৬ জুন ২০২০ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মুদ্রাদোষ

আব্দুল মালেক জাগরণী ৭:২২ অপরাহ্ণ, মে ০৪, ২০২০

print
মুদ্রাদোষ

বাবা-মা’র দেওয়া নাম মফিজুর রহমান, লোকে ডাকে মফিজ বলে। পাঁচ ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চি লম্বা মফিজের গায়ের রঙ দুধসাদা। খুব মিষ্টি চেহারা। চুলগুলো কৃষকের ক্ষেতের ফসলের মতো হাওয়ায় দোল খায়। বিধাতা তাকে গড়ার সময় চেহারায় যতটা মনোযোগ দিয়েছিলেন বুদ্ধির দিকে ততটাই অবহেলা করেছেন। কচুপাতার পানির মত তরল বুদ্ধি। খুব সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকে। দুঃখ পায়, কাঁদে; আবার নিমিষেই ভুলে যায়। গতকাল যে বুকে ছুরি মারতে চেয়েছিল, দরজায় এসে দাঁড়ালেই তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। ভুলে যাওয়া ভালো! ভুলতে পারে বলেই আজকের ত্রাণের চাল চোর, গম চোর, তেল চোরদের কাল নেতা মানাতে পারে।

মফিজ একটা বেসরকারি ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড। সারাদেশ লকডাউনের কারণে সে ব্যাংকে আটকা পড়েছে। লম্বা ছুটিতেও গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার কাছে যেতে পারেনি। এতে অসুবিধা হয়নি। অফিসের স্টোভে দুটো চাল ফুটিয়ে আলু ভর্তা করে দিব্যি খেয়ে নেয়। বিশ-পঁচিশ দিন হয়ে গেল তেমন একটা ভালোমন্দ তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়া হয়নি। মফিজ ভাবল, আজ একটু মাংস ও দুধ কিনবে। একটা ব্যাগ হাতে করে রাস্তার বেরিয়ে পড়ে। হাজির মোড় পার হতেই পুলিশের সামনে পড়ে যায়। শুরু হয় জিজ্ঞাসা।

-তোর মুখে মাস্ক কই? বলেই লাঠির প্যাদানি শুরু। মফিজ পকেট থেকে মাস্ক বের করতে করতেই পুলিশি আপ্যায়ন শেষ। পাছায় হাত বোলাতে বোলাতে মাস্ক পরে নেয়। মাথায় জেদ চেপে যায়, মার যখন খেয়েছে মাংস কিনবেই! সোজা মাংসের বাজারে যায়।
-ভাই, মাংস কত টাকা কেজি?
-একদাম, পাঁচশ’ আশি টাকা।
-আমাকে আপনার দাবনার মাংস আধা কেজি দেন।
-মানে?
-মানে আবার কী! বললাম তো, আপনার দাবনার মাংস আধা কেজি দেন।
-আমার দাবনার মাংস আপনাকে কীভাবে দেব? মানুষের মাংস আপনি কী করবেন?
-আপনার গরুর দাবনার মাংস। এই যে, এই জায়গা থেকে কেটে দেন। দোকানদার বুঝতে পেরে হেসে দেয়। মাংসের দাম পরিশোধ করে, বাসস্ট্যান্ডের মোড়ে যেখানে দুধ বিক্রি করে মফিজ সেখানে যায়।
-চাচা, আপনার দুধ এত পাতলা কেন? বুঝতে পেরেছি, পানি মেশানো।
-না বাপ, এটা খাঁটি দুধ। বুড়ো বয়সে পানি মিশিয়ে দায়ী হব নাকি!
মফিজ কোনো উত্তর না দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। আঠারো-উনিশ বছরের একটা মেয়ে তিনটি দুধের বোতল সামনে নিয়ে বসে আছে। তাকে জিজ্ঞেস করেÑ আপা, এটা কি আপনার দুধ? মেয়েটি কী বুঝে একটু লজ্জা পেয়ে যায়। মৃদুভাবে উত্তর দেয়Ñ জি। Ñআপনার দুধ কত টাকা লিটার?
মেয়েটি উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে এক ভদ্রলোক মফিজের গালে ঠাস করে চড় দেয়। মফিজ গালে হাত দিয়ে নির্বাক চেয়ে থাকে চড়দাতার দিকে।
এবার মেয়েটি খেঁকিয়ে ওঠে, এই মিয়া আমার কাস্টমারকে আপনি মারেন ক্যান? উনি দুধ কিনবেন, আমি বিক্রি করব। মাঝখানে আপনার কী সমস্যা?
লোকটি অবাক হয়ে বলে, হায় রে দুনিয়া! যার জন্যি করি চুরি সেই বলে চোর!