মেড ইন জিনজিরা

ঢাকা, শনিবার, ৬ জুন ২০২০ | ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মেড ইন জিনজিরা

রবিউল ফিরোজ ৭:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২০

print
মেড ইন জিনজিরা

আমি যখন মিতব্যয়িতার উপদেশ দিয়ে কেনাকাটা কম করতে বলি তখন বউ কটমট করে তাকিয়ে বলে, কৃপণ কোথাকার! ছেলে যখন বায়না ধরে, আম্মু জুস খাবো; মায়ের উত্তরের আগেই আমি তখন বলি, না বাবা ওগুলো খেতে হয় না, জুসটুস খারাপ জিনিস। বউ আমার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে বলে, এগুলো তোমার কাছে কবে ভালো ছিল? বখিলতার একটা শেষ থাকা উচিত। কথার উত্তাপে বাধ্য স্বামী আর ভালো মানুষটি সেজে মনে মনে বলি, জীবন-যৌবন, রস-কষ সবই তো বলি দিয়েছি, আর কয়টি টাকা তো নস্যি; নে বাবা নেÑ যা মনে লয় কর।

সকলের অগোচরে বউয়ের সাথে রাগ বিনিময় হচ্ছিল বাসা ছেড়ে এক শপিংমলের তিনতলায়। বউয়ের পারফিউম কেনাসহ আরো কী যেন দরকার। তাই সপরিবারে হাজির চাকচিক্যময় জৌলুসভরা মনকাড়া শপিংমলে। আহা এটা কি আমাদের বাংলাদেশ!

সেলসম্যানকে বলতেই প্রোডাক্টগুলো প্রদর্শন শুরু করে। ম্যাডাম, এটা বাংলাদেশি আইটেম, তুলনামূলক দাম কম পড়বে। তা শুনেই বউয়ের নাক কুঞ্চিত হয়। তাচ্ছিল্যভরে বলে, বাংলাদেশি জিনিস?

মনে হয় বাংলাদেশি মানেই বাজে। আমার মতো সম্ভবত!

আরো আছে ম্যাডাম, এটা ম্যারিকার...

ও মা তাই নাকি! দেখি দেখি...

আর এইটা ফ্রান্সের, আর এই ব্যান্ডটা খুব চলছে, মেড ইন সুইজারল্যান্ড। দেখুন প্লিজ...

বউ দিশেহারা কোনটা রেখে কোনটা ধরে। সময় যাচ্ছে। অথচ সিন্ধান্ত নিতে পারছে না তাই আমাকে বলল, কিছু বলছ না যে? কোনটা কিনি?
বললাম, এসব কেনাকিনি বাদ দাও। ইউরোপ আমেরিকা কিচ্ছু না, সব মেড ইন জিনজিরা।

সেলসম্যান আমার দিকে এমন দৃষ্টি হানল যেন চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। ওদিকে বউয়ের মুখের দিকে না তাকিয়েই বুঝলাম বউটা আমায় কী বলবে। তবে এবার বউ বলল না বটে তবে হাত ধরে টানতে টানতে দোকানের গেটের কাছে রেখে গেল। আমিও প্লাস্টিকের বড়বড় পুতুলগুলোর সামনে আরেক স্থবির পুতুল সেজে গল্প শুরু করলাম। এমনই সময় বউয়ের বড় ভাই মানে আমার সম্বন্ধী ক্যামেরা-টিভি-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে হনহন করে ঢুকে পড়ল। দুটো কথা বোনের সঙ্গে বলতে না বলতে সেলসম্যানকে বলল, আমাদের কাছে অভিযোগ আছে। জিনিসগুলো দেখি?

পারফিউমের সুদৃশ্য বোতলগুলো নিল। একটু পরই বলল, এগুলো বিদেশি নয়।

সেলসম্যান মালিককে ডেকে আনল। সবাই চুপচাপ। মুখ ফিরিয়ে বোনকে বলল, তুমি কী কিনেছ? কাঁচুমাচু বোনটি হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটি মেড ইন ম্যারিকা বের করে দিল।

থমথমে মেঘে ঢাকা মুখ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। পথে কারো সঙ্গে কারো কথা নেই। ভাবলাম ঝড়টা বোধ হয় শুরু হবে বাসায় গিয়ে। কিন্তু পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ কোন দিক থেকে? ভেবে ভেবে গলদঘর্ম হচ্ছি আর নিঃশ্বাস নেওয়ার বাতাস খুঁজছি। বাসায় পৌঁছেই ছেলে বলল, আমার জুস কেনা হয়নি। বললাম, হোম মিনিস্টারকে বলো।

ছেলে যেতে না যেতে বউ হাসিমাখা বদনে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে এল- এ্যাই, তোমার সঙ্গে জব্বার ভাই কথা বলবে, ধরো।

-শাহিদ, তুমি কালকে দশটায় আমার অফিসে এসো। তোমাকে নিয়ে একখানে যেতে হবে।
-ওগো জানো, আমরা কঠিন বাঁচা বেঁচে গেছি।
-ঠকের হাত থেকে কয়বার বাঁচবে?

পরের দিন আমি হলাম তাদের সফরসঙ্গী। কোথায় যেন যাচ্ছে দলবলসহ। আমার কাজ চুপচাপ দেখে যাওয়া। এইটুকু শুধু জানি গতকালের ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরো অনেকেই আছে, যাদের এরা ধরতে চায়।

ঘটনা দেখে বিস্ময়ে থ হয়ে গেছি। এলাকার চিপাচাপা ঘুপচিতে গোপনে গোপনে চলছে আমেরিকা ফ্রান্স কিংবা সুইজারল্যান্ডের সেন্ট বানানো। নামিদামি ব্র্যান্ডের রকমারি কসমেটিকস। দেখতে হুবহু একই রকম বোতল। কোথাও আবার নকল জুসসহ অন্যান্য শিশুখাদ্য বানানোর কাজকর্ম। ভাবলাম আমার গুণধর বউকে নিয়ে আসার দরকার ছিল; দেখে যেত মেড ইন জিনজিরা কারে কয়; কত নামিদামি জিনিস এই মাটিতে তৈরি হয়!