কবি ও আগুনসুন্দরী

ঢাকা, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন ১৪২৭

কবি ও আগুনসুন্দরী

হাসনাত মোবারক ৩:৩১ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৩, ২০২০

print
কবি ও আগুনসুন্দরী

ঢাকার ইডেন ফেরত লাবণ্য সাহা। নামটি কেন লাবণ্য দাশ না হয়ে লাবণ্য সাহা হলো, এটা নিয়ে তার খুব আক্ষেপ। জীবনানন্দ দাশ নামের এক কবির স্ত্রীর নামও ছিল লাবণ্য দাশ। লাবণ্য দাশ ইডেন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। এ সুবাদে সে গর্ববোধ করে। অথচ তার নামটি শেষের অংশের জন্য মেলেনি। একজন বড় কবির প্রাক্তন স্ত্রী হওয়াটাও যে গৌরবের ব্যাপার। এমনকি কবির প্রাক্তন স্ত্রী হলেও যে সুবিধা পাওয়া যায়। এ বছরেও প্রমাণ পেয়েছে।

এক সময় শখ ছিল, জীবনানন্দের মতো কোনো বড় কবির সঙ্গে যদি প্রেম-প্রণয় থাকত! কিন্তু সে বালাই লাটে উঠেছে। বেশিরভাগই ছ্যাঁচড়া জাতীয় লোকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার। এ জন্য প্রেম নামক অমিয় বিষয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে পারেনি। বিবাহের পিঁড়িতেও বসার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।

মা হৈমবালা সাহার একমাত্র কন্যা সে। বড়ই আদরের। মা কখনো কোনো কিছুতে বাধ্য করেন নি মেয়েকে। ছোটবেলায় সুচিত্রা সেনের গল্প শুনিয়ে বড় করছেন। মফস্বল শহর থেকে রাজধানী শহরে রেখে পড়ালেখা করিয়েছেন। সংস্কৃতিমনা মায়ের মেয়ে এক-আধটু কবি, গায়ক হবে এটাই স্বাভাবিক।

এবারের বইমেলায় তার উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে- ‘আমার কোনো প্রাক্তন নাই।’ প্রেম-বিরহের উপন্যাস নামে তার প্রেমপ্রত্যাশী যুবারা বইয়ের প্রচারে ভূমিকা রেখেছে। কাগজের রিপোর্টাররা ব্যাপক প্রচার দিয়েছে। এতে ঢাকা বইমেলাসহ বিভাগীয় বইমেলাতে বইয়ের কাটতি ছিল ভালোই।

লাবণ্য সাহা কখনো কবিতা লেখেনি! একটা কবিতাও কাগজে ছাপা হয়নি। ফেসবুকেও কবিতা জাতীয় তেমন আবেগীয় কথন পোস্ট করেনি। দু’চারটা গল্প অখ্যাত কাগজগুলোতে ছাপা হয়েছে কখনো-সখনো। প্রকাশের ব্যাপারে বড়ই অনীহা। দ্বিধা সংকোচ। পাঠক, সম্পাদক লেখা পড়ে কেমন মনোভাব পোষণ করে। এমন সংকোচে সে কখনোই কাগজগুলোতে লিখতে আগ্রহী ছিল না। যে দু’চারটি অখ্যাত কাগজে তার লেখা মুদ্রিত হয়েছে সেগুলোতেও ওই প্রেমপ্রেয়সীদের চাপে পড়ে। বলতে গেলে অনেকটা জোর করেই লিখেছে। তাদের দৌড় ওই অখ্যাত কাগজ পর্যন্তই ছিল হয়ত। ছাপা হওয়ার পর লেখাগুলো ভালো কী মন্দ তেমন প্রতিক্রিয়া পায়নি। সেসব কাগজ বাজারে তেমন একটা পাওয়া যায়নি। ছাপাকৃত গল্পগলো কাগজের নাম তারিখ উল্লেখসহ মোবাইলে ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করেছিল। এতেই এলাকার পরিচিত ফেসবুক বন্ধুরা তাকে কবি বলা শুরু করেছে।

‘আমার কোনো প্রাক্তন নাই’ উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার পরও তাকে কেউ কেউ বলে, এ বইয়ের কবি লাবণ্য সাহা। এটাতে সে অস্বস্তি বোধ করে। প্রকাশ্যে কিছু একটা বুঝিয়ে দেবে। কবি কাকে বলে আর গল্পকার কাকে বলে, ঔপন্যাসিক কাকে বলে। সাহিত্যের শিক্ষকদের মতো তারও ইচ্ছা হয়, ওই আবালদের কিছুটা বুঝিয়ে দিতে। কিন্তু দেয় না। ফ্যান ফলোয়ার কমে যাবে, এমন ভয় আছে।

তার মফস্বল শহরে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে মফস্বলি সাহিত্যিক-সাংবাদিকরা সাত দিনব্যাপী বইমেলার আয়োজন করে। বইমেলার প্রচার প্রসার সর্বত্র। আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবী, বন্ধুর বন্ধু, দাদার বন্ধু। যত লগনা-লগ্নি আছে। সবাই অনুষ্ঠানে উপস্থিত। একদিকে মেয়ে কবি-লেখক তার ওপরে সুন্দরী ও অবিবাহিতা। একটা সেলফি তোলার জন্য হলেও ছুটে আসছে সবাই। এক্কেবারে ঝাক্কাস অনুষ্ঠান। রমরমা অবস্থা। লাবণ্য সাহার ব্যাংকার দাদার ব্যাংকার বন্ধুও এসেছেন। সবজান্তা স্বভাবের মানুষ ব্যাংকার সাহেব। প্রথমেই জানান দিলেন শিল্পসাহিত্য সমাচার, তাবত বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই তিনি একটা অনুষ্ঠানের মতো করে ফেললেন।

বইয়ের বিপণন কীভাবে করা যায়। হাজার কপি বিক্রির দায়িত্ব ব্যাংকার সাহেব নিজে নিলেন। বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠান। অথচ শুরু করলেন ঘটকালি। রামকান্দিপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষকের ছেলের সঙ্গে লেখকের বিবাহের ঘটকালি শুরু হল। প্রধান শিক্ষকের মারফত স্কুলের শিক্ষার্থীরা যেন এক কপি করে বই কেনে এমন নিশ্চয়তাও দিলেন তিনি। ‘আমার কোনো প্রাক্তন নাই’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন সমাপ্তি হলো। ইডেন ফেরত লাবণ্য সাহা কৌশলে বই বিক্রির জন্য প্রকাশকের পক্ষে একটা স্টলেরও ব্যবস্থা করে রেখেছিল। দু’চারজন চক্ষুলজ্জার খাতিরে লেখককে উৎসাহ দিতে গাঁটের পয়সা খরচ করে বই কিনলেন। লেখকের ব্যাংকার দাদার সেই ব্যাংকার বন্ধু ঘটকালি থেকে বইয়ের বিপণন করলেন বটে। তবে বই হাতে একটা ছবি তুললেন। বই না কিনেই রেখে চলে গেলেন সবার আগে!