নাক ডাকার বিপদ

ঢাকা, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২০ | ২১ চৈত্র ১৪২৬

নাক ডাকার বিপদ

সাইফুল ইসলাম জুয়েল ২:৫০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০

print
 নাক ডাকার বিপদ

ঘাপটি মেরে বসে আছি। এ মুহূর্তে দুই চোখই বন্ধ।
পাশের সিটে বসা মিতু ভাবছে আমি বেঘোরে ঘুমোচ্ছি। অথচ...

নিঝুম রাতে ট্রেনের আওয়াজ ছাপিয়ে আশপাশের লোকজনের প্রতিটি কথা সাউন্ডবক্সের আওয়াজ হয়ে কানে আঘাত হানছে।
বর্ষাকালে ব্যাঙ যেমন ঘাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ করে ডাকে, তেমনই অদ্ভুত অদ্ভুত সব আওয়াজ হচ্ছে আমার চারপাশ থেকে।
নাসিকা গর্জন!

বসে আছি সুন্দরবন এক্সপ্রেসে। খুলনা থেকে ঢাকায় ফিরছি। রাত দুটা পার।
ট্রেনে আমাদের বগিতে যারা জেগে আছে কিংবা অপরের নাক ডাকার বিকট শব্দে ঘুমোতে পারছে না- তারা উসখুস করছে বেশ। একসময় তা বিরক্তি প্রকাশের উপযোগী শব্দগুচ্ছে রূপ নিল। একজন বলল, ‘কী আরাম করে ঘুমোচ্ছে, আমাদের ঘুম ব্যারাম করে!’

আরেকজন বলল, ‘ওনাদের নাকের সামনে একটা করে ঢাকনা দেওয়া যায় না তাহলে আর শব্দ বের হতো না!’
কয়েকজনের নাক ডাকার আওয়াজ তরঙ্গের মতো। যেন ঢেউ খেলে যাচ্ছে। অর্থাৎ, চারিদিকে এখন কেবল ভুস ভুস, ফুস ফুস, ঘ্রত ঘ্রত মিষ্টিমধুর আওয়াজ!
যারা ভাবছেন এ সব আওয়াজই বুঝি এ মুহূর্তে আমার না ঘুমোনোর কারণ, তারা ভুলের জগতে আছেন।
আসল ঘটনা হল, ঘুমোতে চাচ্ছি না। এই রাতের বেলায় যাত্রাপথে যারা অত্যন্ত পরিশ্রম করে আমাদের বগি কাঁপাচ্ছেন, আমিও কিন্তু তাদের দলেরই লোক!

সবাই নাক ডাকতে পারে না। একই সঙ্গে ঘুমোনো আর নাক ডাক- সহজ কর্ম নয় কিন্তু। আমার ক্ষেত্রে জিনিসটা ডাল ভাত। বলা যায়, অনেকদিনের সাধনার ফসল। মিতুর সঙ্গে আমার তখন মাখন মাখন প্রেম। ‘এ বাঁধন যাবে না ছেঁড়া’! তেমনই একদিন ডেটিংয়ে গল্প-আড্ডায় জানায়, নাক ডাকে- এমন লোকদের নাকি ওর হেভভি অপছন্দ! তাতে যদি ওর হবু বরটিও নাক ডাকা পার্টির হয়, বিয়ে ক্যানসেল করতে একমুহূর্ত অপেক্ষা করবে না।

সেই থেকেই প্রবল ভয়ে আছি আমি। রাতের বেলায় পরতপক্ষে ওর সঙ্গে দেখা করি না। কী জানি, কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আমার নাক ডাকার গোমর ফাঁস করে দিই! বারবার চেয়েছি বিয়েটা আগে হোক। তারপর দেখা যাবে- পাখি আমার তার নাক ডাকা স্বামীকে রেখে কোথায় যাবে!

মিতুদের বাড়ি খুলনায়। প্রতিবার বাড়িতে যাওয়ার সময় ও আমাকে ওর সঙ্গে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। ট্রেনে ওর নাকি খুব একা একা লাগে। আমি পাশে থাকলে গল্প-কথায় সময়টা বেশ কেটে যাবে। প্রতিবারই ওর আহ্বান নানা ছলে এড়িয়ে গিয়েছি। এবারে পারলাম না। বাড়িতে গিয়ে মিতু খানিকটা অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। ওদিকে ঢাকায় এক জরুরি কাজে ফিরতে হবে। বাপ-ভাইও বাড়িতে নেই। অগত্যা ওকে ঢাকায় ফেরত আনতে আমাকেই খুলনা আসতে হল।

যাত্রাপথে আমি খুবই সাবধান। কোনোভাবেই যাতে ঘুমিয়ে না পড়ি। নাসিকা গর্জন মিতুকে না আবার ভয় পাইয়ে দেয়! আবার যেন কোনো ‘ক্লোজ-ডাউন দূরে যাওয়ার গল্প’র সূচনা না হয়।

গত দুদিন ধরে ঘুম হয়নি। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আজও না ঘুমিয়ে থাকতে হবে। কয়েক কাপ চা -কফি খেয়েছি। কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বারবার চোখ লেগে যাচ্ছে। তখন মিতু কী জানি একটা বলেছিল। শুনিনি। এখন বুঝতে পারছি, তখন কিছুটা ঘুমের জগতে চলে গিয়েছিলাম। ভাগ্যিস, সেটা কেবল অল্পক্ষণের জন্যই।

নাক ডাকছি না। কিন্তু আশপাশের লোকগুলোর কথাগুলো যেন আমার গায়েই বিঁধছে। একেই বুঝি বলে চোরের মন পুলিশ পুলিশ!
একটু আগে মিতুও বিরক্তি প্রকাশ করছিল। এখন মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমন্ত মিতুকে অন্যরকম লাগছে। অদ্ভুত সুন্দর, প্রেমময়। ইশশ, এ রূপটা এতদিন দেখা হলো না... শালার নাক ডাকার অভ্যাস আমার!

একটু পরে ট্রেনের মধ্যে কে জানি অদ্ভুত আওয়াজে নাক ডাকতে শুরু করল। একজন তো বলেই বসল, ‘শালারা মাইক নিয়ে ট্রেনে উঠল নাকি!’
কতক্ষণ পরে বুঝলাম, এ ট্রেনে যে সাউন্ড সিস্টেম আছে, ওটা তারই বিকল হওয়ার পরে দেওয়া আওয়াজ! চমক কাটতে না কাটতে আরেক চমক এসে হানা দিল। যার জন্য অবশ্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমার একেবারে কানের কাছ থেকেই কারোর নাক ডাকার আওয়াজ আসছে। সামনে-পেছনে উঁকি-ঝুকি মারলাম। না, আওয়াজটা ওদিক থেকে আসছে না। আওয়াজটা আসছে আমার পাশ থেকে, যে পাশটাতে মিতু বসে আছে। যে পাশটাতে মেয়েটা বসে বসে ঘুমোচ্ছে!

ঘুম বাপ বাপ করে পালাল। সারারাত আর ঘুম হলো না। ভাবছি, মিতুকে বিয়ে করা কি আমার ঠিক হবে ওর নাক ডাকার আওয়াজে ঠিকঠাক ঘুমোতে পারব তো আমি মিতুও যে নাক ডাকে, সে কথা কি জানে মেয়েটা বললে বিশ্বাস করবে!

মোবাইল ফোনে ওর নাক ডাকার আওয়াজটা রেকর্ড করব নাকি তাও অবিশ্বাস করবে শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, মিতুকে যদি বিয়ে করি, তবে সবসময় আমিই আগে ঘুমাব। অনেকদিন আগে মশারি টাঙানো নিয়ে আমাদের মধ্যে হালকা তর্কাতর্কি হয়েছিল। শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, প্রতিদিন ঘুমানোর আগে লটারি হবে। কিন্তু এখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, কোনো লটারি-ফটারি নয়। প্রতিদিন ঘুমোনোর আগে মশারিটা আমিই টাঙাবো। যে করেই হোক, মিতুর আগে ঘুমিয়ে পড়তে হবে আমাকে। ভোরের আলো ফুটেছে। কয়টা বাজে- জানতে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। মেসেজ এসেছে।

মিতুর! মেয়েটা লিখেছে- ‘এতদিনে জানলাম, তুমিও আমার মতো নাক ডাকো, জান্টুস! একটু আগে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে, তখনই বিষয়টা টের পেলাম। এখন যে তুমি ঘুমাচ্ছো না, সেটাও জানি। কেননা, তোমার নাক কোনো শব্দ করছে না! এটা কোনো সমস্যাই না। বিয়ের পরে মিশেমিশে চলব, কেমন। অনেক আগে মশারি টাঙানো নিয়ে তোমার সাথে একটু মজা নিয়েছিলাম। কোনো লটারির দরকার নেই, বিয়ের পরে প্রতি রাতে মশারিটা আমিই টাঙাবো, কেমন এতটুকু সেবা করার সুযোগ তো দেবে, জানু!’