বইমেলার সেকাল একাল

ঢাকা, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২০ | ১৮ চৈত্র ১৪২৬

বইমেলার সেকাল একাল

আলম তালুকদার ১:১২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২০

print
বইমেলার সেকাল একাল

এখন যে রূপে বইমেলা আমরা দেখছি শুরুতে এমনটা ছিল না। তা কেমন ছিল? কে বা কারা এ বইমেলার চিন্তক বা অগ্রনায়ক? ইতিহাস ঘাটলে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীন সাহেব বইমেলার অগ্রনায়ক। তিনি যখন বাংলা একাডেমিতে চাকরি করতেন তখন একাডেমিতে প্রচুর বিদেশি বই আসত। এর মধ্যে একটি বই ছিল ‘ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড বুকস’ এখানে ‘বুক ফেয়ার’ শব্দ দুটি তাকে চমকিত করে।

‘বুক ফেয়ার শব্দ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তৎকালীন পাবলিক লাইব্রেরিতে (এখন যেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) সর্বপ্রথম ‘শিশু গ্রন্থমেলা’র যাত্রা শুরু করেন। ঘটনাটি তিনি ঘটান সেই ১৯৬৫ সালে! এতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ১৯৭০ সালে বড় আকারে নারায়ণগঞ্জে বইমেলার আয়োজন করেন।

এ আয়োজনে আলোচক ছিলেন অধ্যাপক আব্দুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম। এ বইমেলায় তিনি এক অবিশ্বাস্য মজার কাণ্ড করেছিলেন। মেলার ভেতরে একটি গরু বেঁধে রেখে তার গায়ে লিখেছিলেন, ‘আমি বই পড়ি না’! ১৯৭২ সালে বইমেলা হয়নি। তবে একাডেমির দেয়ালের বাইরে মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা ও বর্ণমিছিলের তাজুল ইসলাম বই নিয়ে বসেছিলেন। ১৯৭৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন।

১৯৮৪ সাল। অমর একুশে গ্রন্থমেলার আনুষ্ঠানিক শুভযাত্রা। তখনকার মহা-পরিচালক কবি মনজুরে মওলা এ ঐতিহাসিক আয়োজনের রূপকার। তখনকার মেলা হত মূল এলাকাকে ঘিরেই। সেই মেলা ছিল ঘন মেলা। এখনকার মেলা ম্যালা বড় এলাকাজুড়ে। রাস্তা পার হয়ে ওপারে। দুপারে অনেকের যাওয়া হয় না। অনেকের সঙ্গে দেখাও হয় না। আগে দেখা না হওয়ার সুযোগ ছিল না। লাইন ধরে যেতে হত, লাইন ধরে বের হতে হত। এখন বেশি খোলামেলার মেলা! আগে বন্ধের দিন শাহবাগ হতে লাইন দিতে হতো। আর ওইদিকে শিশু একাডেমি! মেলা জায়গা হওয়ার জন্য আর সেদিনের সে চিত্র এ প্রজন্ম দেখতে পাবে না!

যাক সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আমার বেশিক্ষণ থাকা স্বভাব নয়। বইমেলায় থাকবে প্রকাশক, পাঠক ক্রেতা আর লেখক। তার সঙ্গে মিডিয়ার লোকজন। আর কিছু দর্শক। অনেক নতুন লেখক ও নতুন প্রকাশক আছেন। আসল কথা বই ক্রেতা। বার্নার্ড শ একবার তার প্রকাশককে একটি পত্র দিলেন। তাতে কোনো শব্দ নেই। শুধু একটা হোয়াট চিহ্ন (?)। প্রকাশকও কম নন। উত্তর দিলেন আশ্চর্যবোধক চিহ্ন (!) মানে ওয়ান্ডারফুল। পৃথিবীতে নাকি এটাই সবচেয়ে ছোট চিঠি!

আমাদের অবশ্যপাঠ্য বইয়ের লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী জানিয়েছেন. ‘তিনিই প্রডিউসার, তিনিই কন্জুমার্স! তার রম্য খুবই উচ্চমার্গের। এক ধনী মহিলা অনেক টাকা নিয়ে নিউমার্কেটে গিয়ে অনেক বাজার করেছেন। তার টাকা শেষ হয় না। দোকানদার বলল, ম্যাডাম একটা বই নিয়ে যান।

তিনি উত্তরে বললেন, ‘না বই না, বই তো বাসায় একটা আছে’। অন্য এক ম্যাডামকে বলেছিলেন, একটা ভারী কিসিমের বই দেব?

‘হা দিতে পারেন, সঙ্গে গাড়ি আছে অসুবিধা হবে না’। যাদের একটা বই হলে চলে, তারা তো বইমেলায় যাবে না। ভারী বই অনেকে কিনবে না, কারণ সবার তো গাড়ি নেই! আজকাল ঘরে ঘরে লেখক।

আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব, বান্ধবীরাও লেখক। অনেকে ভয়ে বইমেলায় যায় না। যদি অনুরোধে বই কিনতে হয়! বড় বড় লেখকরা নতুন লেখকদের সঙ্গে সময় দিতে চান না। কারণ অনেক লেখক সৌজন্য কপি দিতে চান। যদি বিশটা বই পায় তখন সে বই নিয়ে হাঁটবে কেমতে? বড় লেখকরাও আজকাল চালাক হয়ে গেছেন! সবাই না। কেউ কেউ। এবারের বইমেলার পরিসর অনেক বড়। অনেক নতুন নতুন আইডিয়ার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। মুজিব শতবর্ষের প্রথম বইমেলা। জাতির পিতাকে জানার অবাধ সুযোগ সংযোজন করা হয়েছে। বই উন্মোচন কর্নার একাধিক করা হয়েছে।

বেশ ফিটফাট চনমনে চনমনে ভাব। অনেক প্রকাশক মহাব্যস্ত। অনেকের মুখ গোমড়া! অনেক বিখ্যাত লেখকের হাত ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে। ফেসবুকে প্রচার প্রচারণা চলছে। নানান কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। কেউ জানতে পারছে, কেউ পারছে না। তবে একটা বিষয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। দুস্থদের জন্য একটি সংস্থা একটি বই উপহার নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছবি তুলে দশ মিনিটের মধ্যে ছবিটি বাঁধাই করে দিয়ে দিচ্ছে। এ ভাবনা এবং কার্যক্রম একদম নতুন। শেষে একটা ফাও জোকস। ক্লাসিক বই কাকে বলে? যে বইটির সবাই প্রশংসা করে মাগার কেউ কেনে না!