চোরের বাপের বড় কলম

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

চোরের বাপের বড় কলম

শফিক হাসান ৫:৩৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৯

print
চোরের বাপের বড় কলম

সৎ মানুষের শান্তি-স্বস্তির অভাব থাকলেও নীতিহীন মানুষ কখনোই বড় ভোগান্তিতে পড়ে না। ফাঁকফোকরে তারা ঠিকই অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। এমনই বদ্ধমূল ধারণা ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ড. কুদ্দুসুজ জামানের। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সে ধারণায় চর ধরেছে।

কুম্ভীলকবৃত্তি প্রাচীন পেশা হলেও পেশাজীবীরা ধিকৃত। অন্যদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক কুম্ভীলকবৃত্তিকে সংশ্লিষ্টরা নাম দিয়েছেন গবেষণা। এ-ধারকা মাল ও-ধার করে সহজেই বিদ্বজ্জনের পরিচয় মেলে। এভাবে এগিয়েছেন ড. কুদ্দুসও। শেষকালে কি-না কলমের কালিই কলঙ্ক হয়ে ছিটকে পড়ল ললাটে!

দীর্ঘ এক দশক তার লেখা বই রেফারেন্স হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে পত্রপত্রিকায় তাকে নিয়ে লেখাও হয়েছে বিস্তর। সম্পাদকদের চাহিদা অনুযায়ী যে কোনো ভারিক্কি বিষয়ে প্রবন্ধ-গবেষণামূলক লেখা সরবরাহ করতেন। সময়মতো লেখা পাওয়া যায় বলে সম্পাদক শ্রেণিও তার ওপর সন্তুষ্ট।

অনুরাগ থেকেই যে লেখায় তার ছবি না ছাপলেও চলে, ছেপে দিতেন; যেখানে পাসপোর্ট সাইজ ছাপলেই যথেষ্ট- সম্পাদকরা ছাপতেন বড় সাইজ! সব মিলিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলে নামডাক ভালোই হয়েছে। এভাবেই কাটতে পারত দিন। আবহমানকালের চাপাপড়া কিংবা উপচেপড়া ইতিহাস-ঐতিহ্য গিলিয়ে বুঁদ রাখতে পারতেন পাঠককুলকে, টেলিভিশনের দর্শক-শ্রোতাকে।

কোথাকার কোন ছোকরা অভিযোগ ছড়াল, তিনি নাকি নিশিকুটুম্বের জ্ঞাতি ভাই! ছ্যা ছ্যা, কী গোলমেলে উপাধি। অভিযোগ খণ্ডন করে জানালেন, শত্রু ভাবাপন্নরা গুজব ছড়াচ্ছে। কোটি টাকার মানহানির মামলা করার হুমকিও ধোপে টিকল না। অভিযোগকারী হাজির করল বমাল প্রমাণ। কলকাতার নামকরা এক লেখকের বই থেকে টুকলিফাইং করেছেন। লাইন থেকে লাইন, দাড়ি-কমা, অনুচ্ছেদ কোথাও নেই এতটুকু অমিল!

ঊনিশ শতকে লেটার প্রেসে ছাপা বইটিকে অস্বীকার করার উপায়ও নেই। একশ’ বিশ বছর আগে ড. কুদ্দুসের মৌলিক কীর্তি অন্যরা চুরি করেছেন এমন অভিযোগ কীভাবে জানান! কোনো দিকে সুবিধা করতে না পেরে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন প্রকাশকের নাম। প্রকাশক কবে তার নাম ব্যবহার করে বই ছেপে বাজারজাত করেছে জানেনই না! হুমকি দিলেন প্রকাশকের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার। ‘সৃজনশীলতায় দুর্বৃত্তায়ন : লেখক যাবে কোথায়’ শীর্ষক নাতিদীর্ঘ রচনাও ছাপা হলো দৈনিক কাগজে। রবীন্দ্রনাথের আমল থেকে বর্তমানের প্রকাশকদের নানা বগিজগি আলোকপাত করলেন।

লেখা প্রকাশের পরদিন প্রকাশক সামনে আনলেন সমুদয় তথ্যপ্রমাণ। পাণ্ডুলিপির চুক্তিপত্র, রয়্যালটির রিসিটে সই, হাতে লেখা দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকার কপি- সব ছড়িয়ে পড়ল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার ছাত্র-শিক্ষকরা এতে ব্যথিত-বিরক্ত-আশ্চর্য হলেও সান্ত্বনামূলক কিছুই বলতে পারলেন না। প্রকাশকের প্রতিবাদও ছাপা হলো কাগজে। কারোরই বুঝতে বাকি রইল শিক্ষক হয়ে এতদিন কী করেছেন! ভালো জিনিসই গিলিয়েছেন, তবে সেটা অন্যের!

বেরিয়ে এলো প্রকাশিত অন্যান্য বইও নকল। পাকা চুল ঢাকতে তিনি কলপ ব্যবহার করেন, সেই কলপে কলঙ্ক ঢাকা পড়ল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ত্যক্ত-বিরক্ত হতে থাকল ইয়ার-দোস্তদের টিপ্পনিতে- ‘কী রে, তোগো কুদ্দুস স্যারের পথ ধরবি? কী করবি লেখাপড়া কইরা!’ শিক্ষকরাও বিরক্ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেন। কুম্ভীলকবৃত্তির সঙ্গে জড়িত অন্য একজন মসজিদে মানত, মাজারে শিন্নি বিতরণের সিদ্ধান্ত নিলেন- সব যেন গোপন থাকে!

ব্যক্তির কুকর্মের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যায়ের গায়ে উপর্যুপরি বিদ্ধ হলে ভিসি ডেকে পাঠালেন ড. কুদ্দুসকে। ‘উচ্চতর গবেষণা করেছেন’ এমন উত্তরে ভিসি সন্তুষ্ট হলেন না। অবশ্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিতে পারেননি। এর মধ্যেই একদিন গোটা দশেক ছাত্রছাত্রী হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল কুদ্দুস স্যারের কক্ষে। শোরগোল করে তারা বলল, ‘স্যার, আপনি ছোট লেখা আমাদের সামনেই লিখুন। দেখি, আপনার সুন্দর হস্তাক্ষর!’

গাঁইগুঁই করেও পার পেলেন না। শেষপর্যন্ত এক পৃষ্ঠায় লিখে দিতেই হলো স্বরচিত প্রবন্ধ। সেটা পড়ে হাসতে হাসতে শিক্ষার্থীদের হেঁচকি উঠল। বিভাগের শিক্ষকরাও হাসি চাপতে, মুখ লুকাতে বাধ্য হলেন। ড. কুদ্দুসের স্মরণশক্তি আসলেই ভালো, শৈশবে মুখস্থ করা গরুর চনা এখনও যথাযথভাবে উগরে দিতে পারেন!
সপ্তাহখানেক পরে দেশের জনপ্রিয় একজন লেখক অভিযোগ জানালেন, চলতি সংখ্যা মাসিক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ড. কুদ্দুসের লেখাটি আসলে তার। ফেসবুক দুনিয়ায় ঝড় উঠল আবার। কুদ্দুসুজ জামান বললেন, ‘মহৎ ব্যক্তিরা অভিন্ন চিন্তা করতেই পারেন!’ অভিযোগকারী লেখকের আক্কেলগুড়ুম!

তিনি বললেন, ‘অন্যের লেখা নিজের নামে চালিয়ে ডক্টর সাহেব মহৎ হতে পারেন, আমি নই!’

জুকারবার্গের দুনিয়ায় আশঙ্কা ব্যক্ত হলো, নামের আগে লেজ হিসেবে যে ড-টা তিনি ব্যবহার করেন, সেটা আসল তো! অভিসন্দর্ভে বগিজগি হয়েছে এমন নজির চারপাশে বিস্তর। ‘ডক্টরেটে কত ভেজাল’ শীর্ষক টেলিভিশন প্রতিবেদনে সাংবাদিক ড. কুদ্দুসুজ জামানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অপমানিত হলেন। একপর্যায়ে বলতে বাধ্য হলেন, ‘ছিদ্রান্বেষণ অসৎ মানুষের বৈশিষ্ট্য। উন্নত দেশগুলোর মানুষ গাধার গলায় ঝোলানোর জন্যও ডক্টরেট ডিগ্রি কেনে!’

গৃহীত সাক্ষাৎকার প্রচারের আগেই ড. কুদ্দুসের বাসায় চুরি হল! খবরটি ফলাও করে ‘ছাপা’ হলো ফেসবুকে। তার ল্যাপটপসহ লেখার টেবিল উধাও। চোরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলো নেটিজেনরা! স্বীকার করতে বাধ্য হলো- সব চুরি খারাপ নয়, কিছু কিছু সমাজের সুস্থতার প্রতিষেধক!