নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট ২০২০ | ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতি

সফিক হাসান ২:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৯

print
নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতি

ছেলেরা ছেলেখেলা খেলবে এটাই স্বাভাবিক, মুরব্বিরা যদি বাধা দেন কেমন হয় ব্যাপারটা! গুঞ্জনপুরের ছেলেমেয়ে সবারই অবসর বিনোদন ডাংগুলি খেলায়। এতে দেশীয় বাঁশের ব্যবহার ছাড়া অন্য উপকরণ নেই। দুই ফুটের লাঠির সঙ্গে আঙ্গুল সাইজের ছোট কাঠিই যথেষ্ট। ছোট কাঠির নাম যেমন ‘গুলি’ কাজও করে গুলির মতো! গুলি কারও চোখে কিংবা কপালে পড়লে জীবনের সূর্য আধেকটাই নিভে যাওয়ার আশঙ্কা। ইতিপূর্বে কয়েকবার এমন হওয়ায় খেলোয়াড়রা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল।

গত সোমবার একজন ভ্রাম্যমাণ কটিকটিওয়ালার কপাল ফুঁড়ে দিল গুলি। তিনি মা-বাপকে ডেকে শাপান্ত করে গ্রাম ছাড়লেও ঘটনাটা অন্যান্য গ্রামে ছড়াতে ভুললেন না! কেউ ক্ষতস্থান নিয়ে প্রশ্ন করলেই আসে গুঞ্জনপুরের নাম, এখানকার ছেলেমেয়েরা ত্যাঁদড়। কপাল ফাটিয়েছে, ক্ষতিপূরণ দেয়নি। ময়মুরব্বিরাও ভালো না, তারা সোমত্ত ছেলেমেয়েদের সামলে রাখতে পারেন না। বয়োজ্যেষ্ঠরা হাটে-ঘাটে বদনাম শুনে এসে রামধমকি দিলেন। খেলা বন্ধের হুমকি দিলে খেলোয়াড় কাম উদীয়মান বুদ্ধিজীবীরা ভাবতে বসল। কীভাবে সমাধান করা যায়! বুদ্ধি বের না হলে একে অপরের মাথায় লাঠির মৃদু আঘাত, গুলির গুঁতো দিয়ে মগজে ঝাঁকুনি দিল।

বাঁশের ভেতরে লুকায়িত শক্তি, প্রাকৃতিক উপাদানের কারণেই হোক কিংবা কঠিন অধ্যবসায়ে- একসপ্তাহ পরে খেলোয়াড়কুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলো, সমিতি করা চাই। এই ওই সেই খেলার সংগঠন থাকলেও ডাংগুলি খেলার কাঠামোবদ্ধ রূপ নেই। খেলোয়াড়রা ডাংডাং করে ঘুরে বেড়ালেও কোথাও নিজের পরিচয় দেয় না। হাডুডু খেলোয়াড়রাও ভিজিটিং কার্ডে নিজেদের পরিচয় লেখে গর্বভরে!

গ্রামের ছেলেমেয়ে মিলিয়ে ৭২ সদস্যের উপস্থিতিতে গঠিত হলো নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতি। এর জন্য সরকারি নিবন্ধন থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলো নবনির্বাচিত প্রচার সম্পাদককে। সে মূল কাজ বাকি রেখে প্রথমেই গঞ্জে গিয়ে ভিজিটিং কার্ড বানাল। কার্ড যাকে না দিলেও হয় তাদেরও দিতে থাকল অকাতরে!

নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতির সভাপতি হেকমত মণ্ডল, সাধারণ সম্পাদক সাবিনা বানুর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে প্রথমেই হৃত ইমেজ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলো। দশ গ্রাম ঘুরে খুঁজে বের করা হলো বদনাম ছড়ানো সেই কটকটি বিক্রেতাকে। সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সবাই একদিন তাকে ‘বিশ্রাম’ দেবে। ১১ জন খেলোয়াড় ১১টি ঝাঁকা নিয়ে বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে কটকটি বিক্রি করে সন্ধ্যায় বুঝিয়ে দেবে সমুদয় অর্থ। এমন প্রস্তাবে স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ী বিস্তর খুশি হলো।

নির্দিষ্ট দিনে ছেলেমেয়ে সবার কাঁধে সে একে একে তুলে দিল কটকটির ঝাঁকা। দুজন নারী খেলোয়াড় অস্বস্তির কারণ হলেও তারাই আগ বাড়িয়ে সানন্দে বুঝে নিল কটকটি বিক্রয়প্রণালি! জানাল, কাজে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ থাকতে নেই। সন্ধ্যায় বিক্রিলব্ধ কয়েক হাজার টাকা বুঝে পেলে হাসি বিস্তৃত হলো এই গাল থেকে ওই গালে।

নতুন করে জেলাবাসী জানল গুঞ্জনপুরের ছেলেমেয়েদের মতো মানুষ হয় না! ডাংগুলি শক্তিমানের খেলা, মাথায়ও বুদ্ধি থাকতে হয়। বিক্রেতাদের কেউ কেউ কটকটিগুলো সুবিধামতো জায়গায় হাপিস করে দিয়ে বাবা-মায়ের নগদ অর্থ হাতিয়েছে; অর্থাগমের সুযোগ নেই তারা গোলার ধান, ভাঁড়ারের চাল চুরি করে জুড়িয়েছে প্রয়োজনীয় অর্থ।

সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবার ব্যয়িত অর্থ তোলায় মনোযোগ দিল। যাওয়া শুরু করল বাড়ি বাড়ি। নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতির হয়ে চাঁদা চাইলে খেঁকিয়ে উঠল অনেকেই। খেলুড়েরা বোঝাল, ঐতিহ্যবাহী খেলা হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। টিকিয়ে রাখতেই সমিতির প্রতিষ্ঠা। পর্যায়ক্রমে সদস্য হবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের খেলোয়াড়রাও।

এ জন্য দরকার একটি অফিস ঘর; দূরদূরান্ত থেকে আসা খেলোয়াড়দের থাকার জায়গাও। মুরব্বিরা চাঁদা না দিয়ে খেলাধুলা ছেড়ে কাজে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিলেন। জানালেন বাবা-মাকে দুর্গতিতে রেখে খেলায় সময় নষ্ট করা অনুচিত। এতে অন্যের স্বাস্থ্যহানিও হয়। স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শটা লুফে নিল খেলোয়াড়রা। জানাল, চাঁদালব্ধ টাকা দিয়ে ফান্ড গঠিত হবে, সেখান থেকেই অনুদান দেওয়া হবে আহতদের। মুরব্বিরাও উল্টো বোঝালেন, না খেললে কেউ আহত হবে না!

সদস্যরা চলে গেল ইতিহাসের পাতার বর্ণনায়, ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বে! ইতোমধ্যে পাশের থানার সঙ্গে একটি ম্যাচও অনুষ্ঠিত হলো। গুঞ্জনপুরের বিজয়ের খবর পৌঁছে গেল বহুদূরে। এভাবে আরও কয়েকটা ধাক্কা মারলে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পর্যন্ত যেতে কতক্ষণ! অভাবনীয় সাফল্যের পাশাপাশি নামযশ নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতিকে উন্মাতাল করে তুলল। চাঁদা না পেলে নিজেরাই বিকল্প পথ খুঁজে নেবে প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিতে লাগল।

সঙ্গে যুক্ত হলো গ্রাম গ্রামান্তরের বেকার তরুণ, রাজনীতিতে সুবিধা করতে না পারা বিরোধী দলের ক্যাডাররা। চারদিকে ক্রীড়া-চাঁদার মচ্ছব! একদিন ঘুম থেকে উঠে খেলোয়াড়রা দেখতে পেল পুরো গ্রামই ফাঁকা। খুশিই হলো তারা, আহত হয়ে এখন অন্তত কেউ বদনাম ছড়াতে পারবে না! টাকা খরচেরও ঝামেলা নেই। নিখিল বঙ্গ ডাংগুলি সমিতি মহা উৎসাহে চালিয়ে যেতে লাগল কার্যক্রম!