গ্যাসের মতো ভালোবাসা

ঢাকা, শনিবার, ২৫ জুন ২০২২ | ১১ আষাঢ় ১৪২৯

Khola Kagoj BD
Khule Dey Apnar chokh

গ্যাসের মতো ভালোবাসা

শিমুল শাহিন
🕐 ৬:৪৯ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৫, ২০১৯

গ্যাসের মতো ভালোবাসা

পুরান ঢাকার বেশ প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী রহমত ব্যাপারী! তার স্ত্রী গত হয়েছেন বছর পাঁচেক আগেই! তিন মেয়ে রুনা, ঝুনা আর টুনাকে নিয়েই তার সুখের সংসার। তিন মেয়ের প্রথম দুজনের পড়াশোনায় কোনো মনোযোগ নেই, সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে সিরিয়াল, শপিং আর সাজগোজে! ছোটজন টুনা পড়াশোনায় ভালো- সদ্য ইন্টার পাস করল। রহমত ব্যাপারী মনস্থির করলেন, বয়স তো অনেক হলো, ব্যবসা আর নয়, বিশ্রাম দরকার! ঠিক করলেন তিন মেয়ের বিয়েশাদি দিয়ে জামাইদের হাতে ব্যবসা বুঝিয়ে শেষ বয়সটা ধর্মকর্ম করেই কাটিয়ে দেবেন! তার আগে ঠিক করলেন তিন মেয়ের একটা পরীক্ষা নেওয়ার।

একদিন তিন মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো তো মা জননীরা, আমাকে তোমরা কীসের মতো ভালোবাসো?’

বড় মেয়ে রুনা নিজের মাথার ববকাট চুল কপাল থেকে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘ওহ ড্যাড! আই লাভ ইউ লাইক অ্যা পার্ল!’ রহমত ব্যাপারী বড় মেয়ের কথায় খুব আহ্লাদিত হলেন! সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষণা দিলেন, ‘আমার গুলশানের বিশাল বাড়িটা পুরস্কারস্বরূপ তোমাকে দিলাম!’
দ্বিতীয় মেয়ে ঝুনার পালা এলে বলল, ‘পাপ্পা! ইউ নো, আই লাভ ইউ অ্যাজ আই লাভ গোল্ড!’ মেজো মেয়ের উত্তরেও অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হলেন রহমত ব্যাপারী! ঘোষণা দিলেন, ‘তোমাকে উত্তরার বাড়িটা দিলাম!’

এবার এলো ছোট মেয়ে! টুনা মৃদু হেসে বলল, ‘বাবা, আমি তোমায় গ্যাসের মতো ভালোবাসি!’ শুনে হো হো করে হেসে উঠল রুনা, ঝুনা! কিন্তু রেগে উঠলেন রহমত ব্যাপারী! যে গ্যাসের জ্বালায় অতিষ্ঠ তিনি, এ ডাক্তার ও ডাক্তার করেই জীবন যাচ্ছে! তার সবচেয়ে চালাক মেয়ে এরকম একটা ফালতু জিনিসের সঙ্গে ভালোবাসার তুলনা দিল! এ উত্তরে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, ‘যেমন উত্তর দিয়েছিস, ফলটাও তেমন পাবি! একটা কানাকড়িও তোর জামাই আর তুই আমার কাছ থেকে পাবি না!’ কয়েকদিন পরই বেশ ধুমধাম করে রুনার সঙ্গে এক বিসিএস ক্যাডারের, ঝুনার সঙ্গে এক প্রাইভেট কোম্পানির বড়কর্তার বিয়ে দেওয়া হলো! শাস্তিস্বরূপ টুনার বিয়ে দেওয়া হলো এক শিক্ষিত বেকারের সঙ্গে!

দুই.
সময় গড়িয়ে গেছে! রহমত ব্যাপারী তার সমস্ত সম্পত্তি রুনা আর ঝুনার মধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন! কিছুদিন রুনার বাড়ি, কিছুদিন ঝুনার বাড়িতে থেকেই তার দিন কাটছিল! কিন্তু বছর না ঘুরতেই মেয়েদের কাছে বোঝায় পরিণত হলেন! রহমত ব্যাপারীর সেবা-যত্নে নিয়োজিত বাড়ির চাকর-বাকরদের তাড়িয়ে দেওয়া হলো! দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির অজুহাতে তাকে ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না! গ্যাস খরচ কমাতে তার বহু পুরনো অভ্যাস সকাল বেলা চা খাওয়াটাও বন্ধ হলো! এমনকি উঠতে বসতে মেয়ে আর মেয়েজামাইদের কটু কথা শুনতে হয়! একদিন দুই মেয়ে আর জামাইরা যুক্তি করে রীতিমতো ঘাড়ধাক্কা দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল! বৃদ্ধ মালিকের সঙ্গে বেরিয়ে এলো পুরনো চাকর আবুলও! ঝড়বৃষ্টি মাথায় করে দুজন এদিক ওদিক ঘুরছে! মাথা গোঁজার মতো কোনো জায়গা পাচ্ছে না, তাড়িয়ে দিচ্ছে দারোয়ানরা! এদিকে কয়েকদিন না খেয়ে প্রচ- ক্ষুধা পেয়েছে রহমত ব্যাপারীর! আবুল এদিক ওদিক গিয়েও খাবার সংগ্রহ করতে পারল না!
অনেকটা বাধ্য হয়েই আবুল রহমত ব্যাপারীর হাত ধরে তাকে একটা জীর্ণ বাড়ির কাছে এলো! আবুল দরজায় টোকা দিতেই দরজার ওপাশ থেকে নারী কণ্ঠ বলল, ‘কে?’
আবুল বলল, ‘মা, আমাদের দুটো ভাত খেতে দেবে? আমার মালিক দু’দিন ধরে না খেয়ে আছে!’
দরজা একটু খুলে দিয়ে মহিলা বলল, ‘আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, রান্না করে নিয়ে আসছি!’
খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছেন রহমত ব্যাপারী! ক্ষুধায় কাতর হয়ে আবুলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘দুটো ভাত রান্না করতে এত সময় লাগে?’
আবুল বলল, ‘ঘরবাড়ির যে অবস্থা দেখছি তাতে তো মনে হয় না এদের গ্যাসের চুলা জ্বালানোর মতো সামর্থ্য আছে! গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে বেড়েছে গ্যাসের দাম! হয়তো মাটির চুলোয় খড়ি-লাকড়ি দিয়েই রান্না বসিয়েছে!’
হঠাৎ দেয়ালে টানানো একটা ছবিতে চোখ গেল রহমত ব্যাপারীর! এ যে তারই ছবি! শুধু এ ছবিটা নিয়েই তো বেরিয়ে গিয়েছিল টুনা! বুঝতে বাকি রইল না, রান্না করতে যাওয়া মেয়েটা তার ছোট মেয়ে টুনা! ক্ষুধার্ত, শোকার্ত আর লজ্জিত রহমত ব্যাপারীর চোখের সামনে একটার পর একটা ঘটনা ভেসে উঠল! ভুল বুঝতে পেরে ছুটে গেলেন রান্নাঘরে!
টুনা মাটির চুলোয় ফুঁ দিয়ে রান্না করছিল! ধোঁয়ায় ভর্তি ঘরটা! ধোঁয়া লেগে লাল হয়ে আছে টুনার চোখ- জল ঝরছে! বাবাকে দেখে আশ্চর্য হলো টুনা, আনন্দে চোখ ঝলমল করতে লাগল! রহমত ব্যাপারী টুনার কাছে গিয়ে বসলেন। করজোরে বললেন, ‘মা আমাকে ক্ষমা করিস। কোনটা সত্যিকারের ভালোবাসা আজ বুঝতে পেরেছি! গ্যাসের মূল্য আমি এতদিন বুঝতাম না! এখন জানি, এটার মূল্য সোনা-রূপার থেকে কোনো অংশেই কম নয়!’

 
Electronic Paper