অর্ধশতকের বাহাদুরি

ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

অর্ধশতকের বাহাদুরি

শফিক হাসান ৯:০০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৮, ২০১৯

print
অর্ধশতকের বাহাদুরি

মোমবাতির সংখ্যা ৫০, নেভাতে হবে এক ফুঁয়েই! খ্যাতনামা কণ্ঠশিল্পী মোসাব্বির হোসেন হকচকিয়ে গেলেন জন্মজয়ন্তী পালনে এমন পরিকল্পনায়। বন্ধুরা বোঝালেন, জীবনের ৫০ বছর হারিয়েছে ক্রমান্বয়ে, সেটাকে নিভিয়ে দিতে হবে ফুৎকারেই! তারপর শুরু হবে দ্বিতীয় অধ্যায়ের। অগ্নিপরীক্ষায় জিতলেই তিনি জন্মদিন পালনের যোগ্য।

অনুষ্ঠানের টাকার একাংশের জোগান দিচ্ছেন বন্ধুরাই, তাদের দাবি অগ্রাহ্য করা যায় না। দোকান থেকে কিনলেন ৫০টা মোমবাতি। রিহার্সেল দিয়ে না রাখলে হয়তো গুবলেট পাকিয়ে যেতে পারেন। বাসায় সারিবদ্ধভাবে মোমগুলো রেখে আলোক প্রজ্জ্বলন করলেন মোসাব্বির। শরীরের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ফুঁ দিলেন। ঘটল উল্টো ঘটনা- তিনটা মোম প্রপাত ধরণীতল! কাগজপত্রে আগুন লেগে গেল।

দুর্ঘটনার আলামতে স্ত্রী তেড়ে এলেন- ‘মিনসের কী একটা জন্ম সেটা আবার পালনও করতে হয়! জীবনে কী দিয়েছ তুমি আমাকে? আমি বলেই তোমার সংসারে আছি, অন্য কেউ হলে...।’

স্ত্রীর কণ্ঠসাধায় বিব্রত হলেন তিনি। এমন বেসুরো সাধনা কতক্ষণ চলবে কে জানে। সিদ্ধান্ত নিলেন ফুঁর হুজ্জতিতে যাবেন না। পানিপড়ায় ফুঁ দিয়ে সমস্যাগ্রস্ত মানুষকে মুক্তি দেন এমন কোনো কবিরাজ বাবাকে আনা যাবে। বন্ধুরা খারিজ করে দিলেন এমন বুজরুকি প্রস্তাব। শেষে বিকল্প প্রস্তাব এলো। যেহেতু শিল্পীর ৫০তম জন্মদিন, ৫০ জন সুন্দরী পর্যায়ক্রমে ৫০টা মালা পরিয়ে দেবে। তাদের সাজ-পোশাকও হবে অভিন্ন। ৫০টি লালপাড়ের হলুদ শাড়ি অর্ডার দিয়ে আগে থেকেই বানিয়ে রাখতে হবে।
মোসাব্বির বললেন, ‘৫০টা মালা আমি একগলায় পরব কীভাবে?’

এক বন্ধু চেতে বললেন, ‘তাহলে একটা মালা পরতে চাও? তুমি কি শিশু!’
‘মালা জমতে জমতে মাথা পর্যন্ত উঠলে খুলে নিচে রাখতে পারব?’
‘সেটা তখন দেখা যাবে!’

আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি মিনমিন করে বললেন, ‘একসঙ্গে ৫০ জন তরুণী তোমরা কোথায় পাবে? ফরমালিনমুক্ত ফুল না হয় বিরুলিয়া থেকে আনা গেল!’
‘কোত্থেকে কী আসবে সেই চিন্তার জন্য পরিকল্পনা বোর্ড আছে!’
‘তোমাদের ভাবি যদি এটাকে অন্যভাবে নেয়? মানে বিপুলসংখ্যক নারীর উপস্থিতি...।’

বন্ধুরা আশ^স্ত করলেন, একজন বর্ষীয়ান শিল্পীর লাখো ভক্ত অনুরাগী থাকতেই পারে। এ জাতীয় অনুষ্ঠানে মনোক্ষুণ্ন হলেও প্রকাশ করার সুযোগ নেই!

নানা আয়োজন, মিটিং-সিটিংয়ের পর কাগজে প্রেস রিলিজ পাঠানো হলো। নির্ধারিত সময়ের সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে শুরু হলো অনুষ্ঠান। সাউন্ড সিস্টেম হঠাৎ বিগড়ে যাওয়ায় অনেক দূর থেকে মেকানিক আনতে হলো। এদিকে শিল্পীকে মালা পরানোর মতো কোনো সুন্দরীকেই ম্যানেজ করা যায়নি। যাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সবারই অভিন্ন উক্তি- ‘সামান্য কটা টাকার জন্য প্রেমিক কিংবা স্বামীর মনে কষ্ট দিতে পারব না। শিল্পী হয়েছে তো কী হয়েছে...!’

অনুষ্ঠান শুরুর পরে দেখা গেল, ব্যানার ঝোলানো হয়েছে উল্টো। ছবিতে শিল্পীর মাথা ঝুলে আছে নিচের দিকে! হাতুড়ি-বাটাল এনে সেটাও ঠিক করা হলো। শুরুতেই থাকল শিল্পীর গান। মোসাব্বির ভেবেছিলেন, দীর্ঘদিনের সঙ্গীত সাধনা তার, গান শেষ হলে দর্শকরা ‘ওয়ান মোর ওয়ান মোর’ বলে শোর তুলবে। সে রকম কিছু ঘটল না, সম্ভাবনাও ছিল না। দর্শক সারিতে উপবিষ্ট সামান্য কজন দর্শকের দিকে তাকিয়ে চিকনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে তেরোটি কাগজে আজকের অনুষ্ঠানের সংবাদ ছাপা হয়েছে। সেগুলো ভক্ত-শ্রোতাদের চোখেই পড়ল না!

গানের পরে শিল্পীর বর্ণাঢ্য জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ পাঠ করে শোনালেন চপলা উপস্থাপক। বন্ধুদের কয়েকজন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। অন্যদেরও ভূয়সী প্রশংসা জুটল। কেউ কেউ চামে ব্যান্ডের গান ছাড়া ওইসব আধুনিক গান-ফান এখন শোনে কে- এমন মন্তব্য করতেও ছাড়লেন না। একপর্যায়ে উপস্থাপন ঘোষণা করলেন, ‘এখন মূল্যায়ন ব্যক্ত করবেন শিল্পীর সহধর্মিণী... ইয়ে তার নামটা কাগজে লেখা নেই!’

‘নামহীন’ মুখরা স্ত্রী মঞ্চে উঠলেন নিজের নাম লেখা আমন্ত্রণপত্র নিয়ে। ঘরোয়া আলাপের ঢঙে বললেন, ‘মিনসে আদিখ্যেতা করে আমাকে আমন্ত্রণপত্র দিয়েছে। এই দেখেন, নামটা শুদ্ধভাবে লিখতে পারল না। তার সঙ্গেই কি-না ৩০ বছরের সংসার! আহা রে...!’

আমন্ত্রণপত্রটা তিনি দর্শকদের হাত উঁচু করে দেখালেন। পাল্টা প্রতিক্রিয়াও মিলল সঙ্গে সঙ্গে। শিল্পীর কলেজজীবনের এক বান্ধবী উঠে এলেন মঞ্চে। মাইক্রোফোন থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে বললেন, ‘এই দেখুন, আমার নাম শুদ্ধ! আলেয়া বেগম আলিয়া হতেই পারেন, এটা মামুলি ভুল!’

আলেয়া মুখ খুললেন আবার- ‘আচ্ছা! যার বয়স ৬২ সে কীভাবে ৫০তম জন্মদিন পালন করে, এটাও শুদ্ধ?’
মঞ্চজুড়ে পিনপতন নীরবতা নেমে এলে মোসাব্বির হোসেন এগিয়ে যান মাইক্রোফোনের দিকে। জন্ম কিংবা কর্ম বিষয়েই নয়, সংসারজীবন নিয়েও অনেককিছু বলার আছে তার!