টকির টক্করে

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

টকির টক্করে

আমির খসরু সেলিম ৮:৪৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৪, ২০১৯

print
টকির টক্করে

‘একসময় সিনেমাগুলো ছিল নির্বাক। সেই নির্বাক ছবি অবাক হয়ে দেখাই ছিল আমাদের নিয়তি। হোক বাকহীন, তবু চলমান ছবি দেখে বাকহারা না হয়ে উপায় ছিল না। যেহেতু এর আগে স্থির ছবিই একমাত্র সম্বল ছিল, তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘অস্থির’ মানে চলমান চিত্র, অর্থাৎ চলচ্চিত্রর চালে সবাই মুগ্ধ হয়ে পড়ে।

এই চলচ্চিত্রর সঙ্গে শব্দ যোগ হয়ে মানুষের সঙ্গে এর যোগাযোগ আরও জাঁকিয়ে তুলল। সবাক চিত্রের আকর্ষণে মানুষ বাকবাকুম করতে করতে প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করতে শুরু করে দিল। দর বুঝে বাড়ল দর্শক, দর্শক বুঝে বাড়ল নির্মাতা।’

ছোট চাচা সম্ভবত আমাকেই বলছিল ওসব। আমি ফোনে ‘ক্যান্ডিক্রাশ’ খেলতে খেলতেই বললাম, ‘উ, তারপর?’
“অসংখ্য দর্শকের হাজার হাজার মাথা গুনে বাজার বুঝে নির্মাতারা স্বমাথা ঘামিয়ে প্রায় চুলহীন করে ফেলতে লাগল। নানারকম যোগ-বিয়োগ করে বিনিয়োগে উৎসাহিত হলো তারা। নির্মাতারা নির্মমভাবে গল্প, উপন্যাস, কাহিনী ছেঁকে ছেঁকে নিত্যনতুন চলচ্চিত্র তৈরি করে দর্শকদের জন্য ফাঁদ পাততে লাগল। পাবলিকের নিয়মিত ব্যয়ের ফর্দে যোগ নতুন খরচের আইটেম ‘টকিদর্শন’।”
আমার কানে পুরোপুরি সব ঢুকছিল না। তবুও বললাম, ‘ও আচ্ছা, তারপর?’
‘বছর ত্রিশেক আগেও সিনেমা হলগুলোকে ‘টকি’ বলে সম্বোধন করা হতো। টকির সংখ্যাও ছিল কম। পরে পুরো পরিবেশ বুঝে নিয়ে পরিবেশকের সংখ্যা বাড়ল। আনুপাতিক হারে বাড়ল প্রেক্ষাগৃহের পরিধি। বাহারি নামের অসংখ্য সিনেমা হলে ঝুলতে লাগল রঙবেরঙের সাইনবোর্ড। সব মিলিয়ে সারা দেশ সরগরম করে তোলে এর ছোঁয়া। বর্তমানে এই পরিবর্তন কতটা প্রভাব ফেলছে তা মানুষ মাত্রেই পরিজ্ঞাত। টকি ব্যবসার সঙ্গে সার্থকভাবে নানা রকম পেশা প্রসারিত হচ্ছে। অবশ্য সেই সঙ্গে আয় আর ব্যয়ও।’
আমি তখন একটা কঠিন ‘স্টেজ’ পার করছি। যথারীতি বললাম, ‘ও আচ্ছা, তারপর?’
চাচা তখন বলছিল, “দ্যাখ, কীভাবে মাইকে বলত, ‘হাঁ ভাই, মর্জিনা প্রেক্ষাগৃহে চলছে রোমান্টিক অ্যাকশন, ফাটাফাটি ড্রামা, সাসপেন্স থ্রিলার, সর্বাধুনিক নাচ ও গানের রিমিক্স মসলাসমৃদ্ধ, কমেডি ও ট্রাজেডির পারফেক্ট কম্বিনেশনে তৈরি, নায়ক আক্কাস খান ও নায়িকা লটকন বানু অভিনীত, সপরিবারে দেখার মতো ছবি আলিবাবার চল্লিশ পোলা। হাঁ ভাই...’ কর্ণবিদারক কণ্ঠে এরকম বক্তব্য আমরা প্রায়ই মাইকের জোরালো আওয়াজে শুনতাম। আবার মাইকিংয়ের কথা কানে তুলে টকিগমন করলে, দেখা যাবে কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই। ঘোষণা শুনে যা দেখার আশা নিয়ে সিনেমাহলে যাওয়া তার সঙ্গে কাহিনীর যোগাযোগ নেই বললেই চলে। বলা চলে একধরনের চলমান চালাকি। বিভিন্ন ধরনের ‘কম্বিনেশনের’ কথা বলে একরকমের খিচুড়ি জোর করে গিলিয়ে দেবে । সেই খিচুড়ি দেখে মেজাজ উল্টো খিচড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বাদ দে, চল একটা সিনেমা হলে চক্কর মেরে আসি।”
শুনে আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। প্রবল আপত্তির পরও বাধ্য হলাম যেতে।
তারপর? তারপর আর কিÑ
সিনেমার নাম মহাশত্রুর সঙ্গে লড়াই, কিন্তু আমার প্রথম লড়াইটা বাঁধল টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়িয়ে। সেখানে হাতাহাতি-গুঁতোগুঁতি করেও কোনো লাভ হলো না। এরপরের লড়াইটা বাঁধল টিকিট ব্ল্যাকারদের সঙ্গে। সেখানে মহাযন্ত্রণা পার হয়ে তিনগুণ দাম গচ্চা দিয়ে টিকিট কেটে অবশেষে হলে ঢুকতে পারলাম। পরে টের পেয়েছিলাম পকেটটাও কাটা গেছে এক ফাঁকে। এরপর শুরু হলো সিট খোঁজার লড়াই। এই সিট ভাঙা তো ওই সিটের হাতল নেই। ওই সিটের গদি নেই তো এই সিটের হেলান দেওয়ার জায়গা নেই। সবকিছু সারার পর একটা সিটে বসলাম। তারপর শুরু হলো ছারপোকার সঙ্গে লড়াই। সেই লড়াই লড়তে গিয়ে ভাঙা চেয়ারের বের হয়ে থাকা পেরেকের সঙ্গে খেলাম আচ্ছামতো খোঁচা। ছারপোকারাও ছেড়ে কথা বলল না। শেষপর্যন্ত যখন সিনেমার পর্দায় চোখ রাখতে পারলাম তখন শুরু হলো দৃষ্টিশক্তির সঙ্গে লড়াই। ঝাপসা ছবি, শব্দ বোঝা যায় না, এদিকে আবার ছারপোকারা সমানে আমার শরীরের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। আমি একা মানুষ, কত দিকে সামলাব!