ফন্দি

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ফন্দি

আরাফাত শাহীন ৭:৪৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৪, ২০১৯

print
ফন্দি

আফজাল সাহেব চান না বাসায় মেহমান আসুক। কখনো মেহমান যদি চলেও আসে তিনি ফন্দিফিকির বের করে বাসা থেকে তাড়িয়ে ক্ষান্ত হন। আবার অনেক সময় নিজ মুখে কিছু বলতে পারেন না। তখন স্ত্রী রাহেলা বেগমের সঙ্গে গিয়ে গায়ের ঝাল ঝাড়েন। একবার আফজাল সাহেবের শালা বাবুল তিন দিন ধরে এসে ঘাঁটি গেড়ে বসে রয়েছে। আফজাল সাহেব মুখে কিছু বলতে পারেন না। সহ্যও করতে পারেন না। শেষে স্ত্রীকে ধরলেন- ‘তোমার ভাই তিন দিন হলো আমার বাসায়। যাওয়ার নামগন্ধও নেই। এখনই চলে যেতে বলো।’

রাহেলা বেগম তরকারি কাটছিলেন। এমনিতে মেজাজ গরম। তিনিও চটে গেলেন- ‘আমি বলব কোন দুঃখে? তোমার বাসা, পারলে নিজে তাড়িয়ে এসো।’

আফজাল সাহেবের মাথাও গরম হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে সুরে বললেন, ‘দেখো, সংসারে এমনিতেই অভাব। বাড়তি একজন মানুষ নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া করলে পথে বসতে বেশিদিন লাগবে না।’

‘তাই বলে আমার ভাইকে তাড়িয়ে দেবে! তুমি নিজে গিয়ে আমার বাপের বাড়ি দিনের পর দিন থেকে আসো। আমাদের বাড়ির কেউ কখনো তোমাকে তাড়িয়েছে?’
জবাব দেওয়ার সাধ্য নেই। গত সপ্তাহেই শ^শুরবাড়ি থেকে এসেছেন। অগত্যা শালা বাবুলকে তাড়াবার চিন্তা বাদ দিতেই হলো।

সেবার শালা বাবুল টানা ১৩ দিন থেকে তবেই বিদায় হয়েছিল। আফজাল সাহেব রাগে জ্বলেপুড়ে গেলেও বউয়ের ভয়ে শব্দ করতে সাহস পাননি। পাছে কোনো বেফাঁস কথা বলে বসে! সংসার বড়ই বিচিত্র। যে কাজটি মানুষ ঠেলায় না পড়লে করতে চায় না, বারবার সেটাই করতে হয়। আবারও বাসায় মেহমান হাজির! ইনিও আফজাল সাহেবের শালা বাবুলই।

একটু দূর সম্পর্কের! এ শালার গোষ্ঠীই শেষ পর্যন্ত আফজাল সাহেবের হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয় কি-না কে জানে! বিকেল বেলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পেপার পড়ছিলেন তিনি। প্রতিদিন এ সময়ে পত্রিকার ফান ম্যাগাজিনগুলোর পাতা ওল্টান। তাতে মন-মেজাজ একটু হলেও ভালো থাকে। আজকাল পত্রিকা উল্টানোই দায় হয়ে পড়েছে। শুধু খারাপ সংবাদে পাতা ভর্তি। পত্রিকা পড়ে হার্ট অ্যাটাকের পরিমাণও বেড়ে গেছে। তাই পত্রিকার মূল অংশ বাদ দিয়ে ফান ম্যাগাজিনগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েন। এগুলোতে নিরেট হাসির খোরাক থাকে। হাসলে হার্ট ভালো থাকে!
‘দুলাভাই, কেমন আছেন?’
বিকট শব্দে সালামের আওয়াজে আফজাল সাহেব চমকে উঠলেন। এত জোরে কেউ সালাম দেয়! দেখলেন রাহেলার মামাত ভাই সদরুল! হতভাগাটাকে আফজাল সাহেব একেবারে সহ্য করতে পারেন না। এতক্ষণ মজার মজার গল্প পড়ে মন যতটা ভালো হয়েছিল সদরুলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে তার চেয়ে কয়েকগুণ খারাপ হয়ে গেল। শালা ব্যাগ-পত্তরও নিয়ে এসেছে!
আফজাল সাহেব দায়সারা গোছে সালামের জবাব দিলেন। সদরুলের সালামের বিপরীতে তার জবাবকে হাতির ডাকের পাশে ভেড়ার আওয়াজের মতো মনে হলো। সদরুল আফজাল সাহেবের পা ছুঁয়ে কদমবুসি করল। আফজাল সাহেব পারলে ঘাড় ধরে বের করে দিয়ে আসেন। কাজটি করতে পারলেন না। বিপদ সিরিয়াল ধরে আসছে। আপন শালা বিদায় হতেই এবার মামাত শালা জুটেছে। এরপর কে!
রাহেলা বেগম ভাইকে দেখে এগিয়ে এসে আদুরে স্বরে বললেন, ‘ভেতরে আয়। কতদিন তোকে দেখি না! মুখখানা কেমন শুকিয়ে গেছে!’
আদিখ্যেতা দেখে আফজাল সাহেবের পিত্তি জ্বলতে লাগল। কিছু বলার সাহস পেলেন না। বউয়ের সামনে কথা বলা নিরাপদ নয়।
আফজাল সাহেব তখন থেকেই সদরুলকে তাড়ানোর চিন্তাভাবনা করতে লাগলেন। কোনোটাই যুৎসই মনে হলো না। শেষমেশ একটা পরিকল্পনা মাথায় ঢুকল। মনে মনে নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে দিলেন।

রাতে ঠিক হলো সদরুল নিচের ঘরেই থাকবে। আফজাল সাহেব নিজেই পরিকল্পনা করেছেন। নিচের ঘরটিতে বহুদিন কেউ থাকে না। আফজাল সাহেব নিজে গতকাল পরিষ্কার করেছেন। একটা জিনিস খেয়াল করেছেন, এই ঘরে কোনো মানুষ ঘুমাতে পারবে না। সদরুলের জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত ঘর হতেই পারে না!
পরদিন ঘুম থেকে উঠেই সদরুলের ঘরে গেলেন। পরিকল্পনা কেমন কাজে এসেছে না দেখলে শান্তি নেই। সদরুল ঘরে নেই! নিশ্চয়ই ছারপোকার কামড় সহ্য করতে না পেরে ভেগেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এবারের মতো তাহলে ল্যাঠা চুকেছে!

নিজের ঘরে ফিরে আফজাল সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। তার সামনে হাসি হাসি মুখ করে সদরুল দাঁড়িয়ে! হাসির চোটে তার সব দাঁত মাড়িসুদ্ধ দেখা যাচ্ছে। অন্য সময় হলে সদরুলের এ হাসি মন ভালো করে দিতে পারত। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। আফজাল সাহেব কিছু বলার আগেই সদরুল বলল, ‘এ ঘরে ছারপোকার বেজায় অত্যাচার। সারা রাত ঘুমাতে দেয়নি। সকালে উঠে ছারপোকার ওষুধ আনলাম। সপ্তাহ খানেক থাকতে হবে তো!’
সদরুলের হাসি যেন খানিকটা চওড়া হলো। আফজাল সাহেব কী করবেন বুঝতে না পেরে সোফার ওপর মুখ হাঁ করে বসে পড়লেন!