প্যাকেজের প্যাকেট

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্যাকেজের প্যাকেট

শফিক হাসান ৮:২৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০১৯

print
প্যাকেজের প্যাকেট

যে বছর সিমে উপচে পড়েছিল গাছ, সেবারই বাজার থেকে মোবাইল সিম খরিদ করেছিল জোবেদ আলী। কবে থেকে ফোন ব্যবহার করছে এমন প্রশ্নের জবাবে শুনিয়ে দেয়, সিমের বাম্পার ফলনের বছরের কথা!

জড় বস্তুও টাকার পাগল হয় বুঝেছে, সিমের সংস্পর্শে আসার পর। ব্যালেন্স কমলে অনুগত ভৃত্যের মতো সিম বলে- দ্রুত রিচার্জ করুন! টাকা না থাকলে মোবাইল ফোনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আপার অনুরোধ রাখতে পারে না। সে একাই অনুরোধ রক্ষা করে। যখন বিচার্জ করার সামর্থ্য থাকে না, প্রয়োজনীয় কলটা করতে দেওয়ার জন্য আপাকে নানাভাবেই অনুরোধ করে। নাছোড় আপা সিদ্ধান্তে অটল- ফেলো কড়ি মাখো তেল!

তবুও জোবেদ আপার সব অনুরোধ রক্ষা করে চলে। হিসাবনিকাশ করে দেখেছে, আপাই সবচেয়ে আপনজন! রাগ করে একবার বউ চলে গিয়েছিল বাপের বাড়িতে, পরদিন বাবাও তাকে পিটিয়ে বাড়ির বাইর করে দেন! এ সময় আপা খোঁজ দিয়েছিল জনপ্রিয় গান ও কৌতুকের। ততদিনে জিবি এমবি প্যাকেজ- কঠিন ইংরেজি শব্দগুলো রপ্ত করেছে।

একবার মোবাইল ফোনের আপা জানালেন হার্টথ্রব নায়িকা বেলার সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে মেসেজ পাঠান ৯৮৭ নম্বরে। নায়িকা তো জোবেদের গ্রামেরই! নম্বর সংগ্রহ করে কল করল, আপা চিনতে পারল তাকে। জোবেদ বলল, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে মেসেজ পাঠাতে হবে কেন! গ্রামে আসবেন না আর?’
‘তুই মেসেজ পাঠা লক্ষ্মী ভাই!’

নায়িকা আপার অনুরোধে মেসেজ পাঠাল সে। দুদিন পর আপা নিজেই কল দিলেন- ‘আরও কয়েকটা মেসেজ পাঠা!’
‘৭০০টা পাঠানো শেষ!’

‘যত হাজারবার খুশি পাঠানো যাবে!’
‘এত টাকা পাব কোথায়? বাজারে ধানের দাম কম! গ্রামের লোক বাকিতে কিনতে চায়।’
‘সোনা ভাই, পরে পুষিয়ে দেব!’

অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে গিলতে পথে বসার উপক্রম জোবেদের। বিদ্রোহ করলে আপা বললেন, ‘যত বেশি মেসেজ আসবে আমি তত বড় নায়িকা হব!’

এই ধন্দ কাটার আগেই আরেকটা অফার আসে- ৪২০ নম্বরে মেসেজ পাঠালেই পাবেন পছন্দের তারকার সঙ্গে ডিনারের সুযোগ! এসএমএস, ভিডিওসহ ইন্টারনেটের নানা প্যাকেজে সাড়া দিয়ে এমনিতেই কাহিল দশা। ঘনিষ্ঠ নায়িকা গ্রামে থাকায় এবার লোকসানে গেল না জোবেদ। ভালো সেবা পেতে তিনবার সিম পাল্টেছে সে। কোম্পানি পাল্টালেও ভেতরের আপা তাকে ছেড়ে যায়নি! এখনও মধুর কণ্ঠে রাত-দিন একপাক্ষিক গল্প করেন। কানে সমস্যা থাকায় জোবেদের কথার উত্তর দেন না!

কোম্পানি দিল সুবর্ণ অফার (শর্ত প্রযোজ্য)- মাত্র ৩ টাকা রিচার্জে ৩০০ মিনিট টকটাইম; সময় রাত ১২টা থেকে ৫টা! প্যাকেজ নিয়ে কল দেবে কাকে! পুকুরঘাটে বসে চিন্তাভাবনার পর প্রথম কলটা দিল পাশের গ্রামের কুসুম আপাকে। তিনি যারপরনাই বিরক্ত- ‘তুই আজীবন বলদই থাকবি?’

এ কেমন আচরণ, বলদরা প্যাকেজ কেনে নাকি! দ্বিতীয় ধাপে এল সদর হাসপাতালের ডাক্তারের সিরিয়াল। তার কাছে মাঝে-মধ্যে যেতে হয়। বলল, ‘স্যার, আমার রোগ সেরেছে। এখন কী করব?’

কাঁচা ঘুম ভাঙানোয় রেগে গেছেন তিনি। বিপদের সংবাদের বদলে পেলেন ফাও প্যাঁচাল- ‘এটা জানানোর জন্যই কল করেছ?’
‘কোম্পানি আমাকে ৩০০ মিনিট কথা বলার সুযোগ দিয়েছে পানির দামে। আপনি পাননি?’
‘সামনে আয়, তোর সব রোগ ছোটাব!’

খুশির বদলে রাগ দেখে হতাশই হলো জোবেদ। একে তাকে ওকে কল করতেই থাকল। ভোরের আগেই ৩০০ মিনিট শেষ করতে হবে। নইলে সব মিনিট পচে যাবে! ফজরের আগে শহরে থাকা বড় খালু সব শুনে ইমোতে কল দিয়ে বললেন, ‘ওইসব জিবি-এমবি ব্যবহার করলে স্বল্পজীবী হতে হয়। মানুষ হয় নিশাচর!’

তত্ত্বকথায় কান না দিয়েও ৩০০ মিনিট শেষ হলো না; সকালে মাথার চুল ছিঁড়ল! কোম্পানিগুলো ধামাকা অফার দিতে থাকলে একদিন চটের বস্তা নিয়ে কাস্টমার কেয়ারে হাজির হলো জোবেদ। লোকজন স্যার সম্বোধনে সম্মানও জানাল। সুন্দরী এক আপাকে জোবেদ বলল, ‘আরও কী কী প্যাকেজ আছে একত্রে দিয়ে দেন!’

‘অবশ্যই স্যার। আপনি আমাদের ভিআইপি কাস্টমার! পাবেন।’
অনেক সময়-শ্রম বিলিয়ে পাঁচ বছর পর একদিন জোবেদ সিমটা লাল সুতায় বেঁধে ঝুলিয়ে দিল তালগাছের আগায়! সিমটা বৃষ্টিতে ভিজলে, রোদে শুকায়। রোদে শুকালে বৃষ্টিতে ভেজে। প্যাকেজের ফাঁদে প্যাকেটবন্দি জোবেদ ইটের বদলে ফিরিয়ে দিল পাটকেল!