ইহকাল পরকাল

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

ইহকাল পরকাল

শফিক হাসান ৮:৩১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২১, ২০১৯

print
ইহকাল পরকাল

ছেলেকে বিয়ে করিয়ে অবসরে কথার মানুষ পাবেন বলে ভেবেছিলেন জোবেদা খাতুন, জুটল ঝগড়ার সঙ্গী! ঝগড়া-ঝাটিও কথাই, উচ্চস্বরে বলতে হয়- এই যা। বিয়ের দ্বিতীয় দিনেই নবরূপে আবির্ভূত হলেন, পরিবর্তনটুকু পাড়াপ্রতিবেশী ধরতেই পারল না। যে যুদ্ধ ঘরে ঘরে, নতুন করে কোথাও সেটা দেখলে অস্বাভাবিক মনে হয় না।

পুত্র-পুত্রবধূ দেরিতে ঘুমিয়েছে, বেলা করে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। বউ আমিনা সতর্ক, স্বামীকে ঘুমন্ত রেখেই গোসল সেরে হাত দিয়েছে সংসারের কাজে। শ্বাশুড়ি জোবেদা খাতুনের ঘুম ভাঙলে দেখেন উঠানে জামা-কাপড় শুকানোর বাঁশের খুঁটির দুই প্রান্তে ঝুলছে আমিনার ভেজা শাড়ি। কোথা থেকে গলায় তেজ এলো জানেন না, চিৎকার দিলেন- ‘ওই নবাবের বেটি, এখানে কাপড় দিছিস কোন আক্কেলে!’

আমিনা থতমত খেয়ে বলল, ‘তাইলে কোন জায়গায় শুকাতে দিমু, মা?’
‘ওইডাও আমি কইয়া দিমু!’ ফজরের নামাজ পড়ে না ঘুমানো যাদের অভ্যাস, গাঁয়ের এমন কয়েকজন বউ-ঝি এলো নতুন বউ দেখতে। এরা আমিনাকে বুদ্ধি দিল, ঘরের ভেতরে গোপন কোথাও জামা-কাপড় শুকাতে দিতে।

আমিনা অনেক খুঁজেও যুৎসই জায়গা পেল না। আরও মানুষের যাতায়াত বাড়লে ফের চিৎকার শোনা যায় জোবেদা খাতুনের- ‘ওই নবাবের বেটি, নুনের দাম কমছে নাকি, আটার রুটিতে মুঠ কইরা দিছোস?’

আমিনা থতমত খেল আবার। আত্মপক্ষ সমর্থনের ঝুঁকিতে গেল না। শাশুড়ির মেজাজ চড়বে আরও। নিজেদের বাড়িতে রুটি বানানোর সময় এটুকু পরিমাণ লবণই দিত সে। পশ্চিমপাড়ার জব্বারের মা সান্ত্বনা দিল জোবেদা খাতুনকে- ‘নতুন মানুষ, দেখতে দেখতে ঠিক হইয়া যাইব’। নতুন বউ দেখে যারা প্রসন্ন হলো, তারা দুই মিনিট বেশি অবস্থান করল। দাদি-নানি সম্পর্কের মানুষদের সালাম দিয়ে পান সাজিয়ে দিল আমিনা। মিয়াবাড়ির মন্টুর দাদির পানে চুনের পরিমাণ কম পড়ায় তিনি মন্তব্য করলেন, ‘কতটুকু চুন লাগে, আন্দাজ নাই তোমার?’

জোবেদা খাতুন পেলেন আরেকটা অস্ত্র- ‘আন্দাজ-আক্কেল থাকব কেমনে, বাবা-মা কিছু শিখাইছে! বিয়া দিয়া আজাইর হয়েছে। যত্ত জ্বালা আমার ঘাড়ে!’
হল্লাচিল্লায় ঘুম ভাঙে বাড়ির একমাত্র ছেলে রহিমের। চোখ রগড়াতে রগড়াতে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে সে। আমিনা অপরাধীর ভঙ্গিতে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল। তাকে দেখে রান্নাঘর থেকে ত্রস্ত ভঙ্গিতে পালাল বেড়াল। রহিম বলে, ‘কী হইছে মা, চিক্কুর পাড়তাছ ক্যান?’

মমতাময়ী আজ ক্ষমতা দেখান- ‘চিল্লাই কি সাধে! কী বউ আনলি, সংসার ছারখার করতাছে! বউরে কিছু শিখাইলি না?’
‘আমি শিখামু, কী কও!’ রহিম যেন কাঁটাওয়ালা তালগাছ থেকে হড়কে পড়ে।

‘তয় কে শিখাইব? তোর শ্বশুর-শাশুড়ি তো স্কুল-মাদ্রাসা চিনায় নাই!’
পরিস্থিতি প্রতিকূলে দেখে বউ-দর্শনধারীরা ধীরে ধীরে বাড়ি ত্যাগ করে। বউ-ঝি, ছেলে-বুড়ি সবার মনেই আক্ষেপ- কী জামানা আইল, মাইয়ারা খাট-পালঙ্কে শুইয়া-বইয়া খাইতে চায়! মুরব্বির খেদমতে, কাজ-কামে মন নাই!

দ্বিতীয় দিনের প্রথম প্রহরে এমন অভ্যর্থনায় মুষড়ে পড়ে আমিনা। রান্নাঘরের জলচৌকিতে বসে ক’ফোটা অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে কেবল, এ সময় ননদ এসে অভিযোগের সুরে বলে, ‘কেমনে কাপড় দিলা ভাবি, আমার থ্রিপিস ভিইজা গেল! কী পইরা মাদ্রাসায় যামু!’

ঘরে ঢুকে আমিনা দেখে, কাঠের আলনার শেষপ্রান্তে থাকা পোশাক শাড়ির পানিতে ভিজেছে কিছুটা। বিব্রত হয়ে বলে, ‘অন্য কাপড় পইরা যাও!’
‘আমার কি আর জামা-কাপড় আছে!’

চতুর্থ দিনে আমিনাও মুখ খুলতে বাধ্য হলো। বুঝে গেছে, খাণ্ডারনির সংসারে নীরব থাকলে অপদস্থই হবে। সকালে রহিমের কাছে মা একগাদা অভিযোগ জানালে রাতে বউ আনে আরেক গাদা। মায়ের মন রাখতে গেলে বউয়ের মন ভাঙে, বউয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখালে মায়ের গালি শুনতে হয়। পাড়াপ্রতিবেশীর কাছে বিচার যায়- ‘বউ পাইয়া মায়েরে বান্দি ভাবা শুরু করছে পোলায়!’

অবস্থার উন্নতি না ঘটায় এক দিন শ্বশুর আসেন। রহিমের কাছে কাবিনের টাকা দাবি করে জানান, অশান্তির সংসারে আমিনা থাকবে না! বউকে ছাড়তে চায় না রহিম। নুন আনতে পান্তা ফুরায়, কাবিনের টাকা জোগাবে কোথা থেকে!

মেয়েকে প্রতিশ্রুত সোনার গহনা না দেওয়ায় বেয়াই-বেয়াইনের একপশলা ঝগড়াও হয়। একপর্যায়ে জোবেদা খাতুন গলা চড়িয়ে বলেন, ‘আপনের মাইয়া থাকব ক্যান, হে তো লাইঙ্গা ধরছে!’

রহিম পড়েছে উভয় সংকটে। মা-বউ কাউকেই ছাড়তে পারে না; তাদের দুজনের একটুও বনিবনা হয় না। সংসার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রহিম এক গভীর রাতে ঘর ছাড়ে। কামরূপ কামাখ্যায় যাওয়ার ম্যাপ পেয়েছে আগেই। ওখানে গিয়ে সাধু হয়ে কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন। ১০ বছর পরে জটাধারী চুলের সাধু হয়ে যায় সে। সিদ্ধি লাভের পর অভিশাপ দেয়- বিবাহিত জীবনে সে শান্তি পায়নি; বাংলার কারও ঘরেই যেন শান্তি-স্বস্তি না থাকে!

এই গল্প সাড়ে ১২শ’ বছর আগের। রহিমের অভিশাপে বর্তমানে গ্রাম-শহরের ঘরে ঘরে ঢাল-তলোয়ারহীন যুদ্ধ চলছে প্রতিদিন।

স্বামী-বউ-শাশুড়ি-দেবর-ননদের যুদ্ধে প্রতিবেশীরা পায় বিনোদনের রসদ! আবার তারাও অজান্তে বিনোদন বিলান অন্যদের জন্য!