বিষকাঁটা

ঢাকা, শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

বিষকাঁটা

শফিক হাসান ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০১৯

print
বিষকাঁটা

ইলিশ মাছ সাধারণের নাগালে আসার পর থেকেই সামিয়ার বুকে বিষকাঁটা ক্রমেই ঘাই দিতে শুরু করেছে! বাসার কেয়ারটেকারের ইলিশ কেনার পরদিন জেনেছে ছুটা কাজের বুয়ারও সামর্থ্য হয়েছে। কেয়ারটেকার রহিম, বুয়া মরিয়ম ও তাদের পরিবার খুশিতে বাকবাকুম হলে বিষকাঁটাটা কেন যেন সজোরে বিঁধিয়ে দিয়েছে সামিয়ার বুকে। প্রেস্টিজ নামতে নামতে এত নিচে নেমে গেছে, ইলিশ গরবে গরবিনী হতে বাঁধছে এখন!

কী একটা দিন ছিল আগে! পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা কেজির ইলিশ কিনে আত্মগর্বে বলীয়ান হয়ে বাসায় ফিরত সামিয়ার নব-বর নাহিদ। এই ইলিশ ফ্রিজে ঢুকিয়ে যৌথ সেলফি আপলোড করা ছিল সামিয়া রহমানের নিত্যদিনের কাজ। বহমান সময় তার অভ্যাসে হানা দিয়েছে। এখন যে কেউই খাওয়ার আগে ইলিশের ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দেয়। ভাজা ইলিশ, রাঁধা ইলিশ তো দেয়-ই; কোনো কোনো হতচ্ছাড়া এমন কুকথাও লেখে- আমি কিন্তু ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানি! রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে গণতন্ত্র-জ্ঞান সামিয়ার ভালোই; কিন্তু ইলিশ কিংবা সখের যে কোনো জিনিসের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র, সার্বজনীনতায় আস্থা রাখতে পারে না। কিছু জিনিস থাকতে হয় ‘সংরক্ষিত’!

গত বছরের ঠিক এই সময়টাতে ইলিশ খেতে গিয়ে গলায় কাঁটা বিঁধেছিল। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে, মোবাইল ফোনে কল দিয়ে খবরটি রাষ্ট্র করে দিয়েছিল সামিয়া। ফুপুমণিকে কল দেওয়ার পর তিনি বললেন, ‘ইলিশ কিনেছিস? কত টাকা কেজি রে!’

‘বেশি না। দশ হাজার।’
‘এটাকে কম বলছিস! আমাদের পাশের বাড়ির ছেলেটা শহরের দোকানে চাকরি করে। মাসে পাঁচ হাজার টাকা বেতন পায়...।’
ফুপুমণিকে থামিয়ে বিরক্তিভরে সামিয়া বলল, ‘তুমি জানো, নাহিদ কত বড় অফিসার। তার সঙ্গে যাকে তাকে মেলাও কোন আক্কেলে!’
বিরক্তি দেখালেও মনে মনে ঠিকই খুশি হয়। দেখুক সবাই, কত ঠমক তার! এরপরই ফেসবুকে দ্বিতীয় স্ট্যাটাসটা দিল (ফিলিং অ্যাংগ্রি)- পচা মাছ গছিয়ে দিয়েছে হারামি দোকানি! মাছের চেয়ে কাঁটা বেশি, সেই চোখা কাঁটাই বিঁধেছে গলায়!

কমেন্টে অনেকেই অনেক রকম পরামর্শ দিয়েছে। কেউ দিল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঠিকানা ও সিরিয়াল পাওয়ার ফোন নম্বর! সবচেয়ে বেশি পরামর্শ এসেছে- ভাত দলা করে গিলে খান! সেই চেষ্টার আগেই কাঁটা নেমে গেছে। খবরটা চাপা দিয়ে কাঁটা বেঁধার সংবাদটি না জানিয়ে পেটের ভাত হজম হচ্ছিল না। তাই অনেক দিন পর পাড়া বেড়াতে বের হলো। এই বাসা ওই বাসায় যাওয়ার পর গেল রহমত ভাবির কাছে। দেশব্যাপী চলমান যে শুদ্ধি অভিযান তাতে রহমত সাহেবের নামও বেরিয়েছে। কাগজে ছবি ছাপা হওয়ার পর থেকে ভাবির আনন্দ ধরে না। সবাইকে বলে বেড়াতে লাগলেন- ‘দেখুন, আমাদের বাবুর আব্বা কত্ত বড় মানুষ হয়ে গেছে!’

সামিয়া যখন ইলিশকেত্তনের মওকা খুঁজছে ভাবি বের করলেন পত্রিকা- ‘দেখুন ভাবি, আজও বাবুর আব্বার ছবি ছাপা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন আমার ছবিও ছাপা হয়ে যাবে; কী বলেন?’

বিরক্ত হয়ে সামিয়া বলল, ‘শুধু ছবিই দেখাচ্ছেন, শিরোনাম পড়েন! লেখা আছে- রহমত উল্লাহর আরেকটি বড় দুর্নীতির খোঁজ পেয়েছে দুদক!’
‘সব ষড়যন্ত্র। আপনিই বলেন, বাবুর আব্বা কি এমন মানুষ!’

‘আমার বিশ^াস হয় না। নাহিদের নামেও তো লোকে কতকিছু বলে! মনে হয় এসব পত্রিকাওয়ালারা বানিয়ে লেখে।’

মনে মনে বলে, ‘কোন তরিকায় এসব ঠাঁটবাঁট দেখাও, বুঝি না আবার! নির্লজ্জ কোথাকার!’ এসেছিল গলায় কাঁটা বেঁধার গল্প শোনাতে, এর মধ্যে রহমত ভাবি শোনাতে শুরু করলেন যে সোফায় দুজনে বসেছে সেটার কুশন তার ছোট ভাই জার্মানি থেকে পাঠিয়েছে। প্রদর্শনবাদী মানুষের সঙ্গে আলাপ করে তৃপ্তি পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে উঠতে হলো তাকে। খুঁজে বের করতে হবে নতুন বাসা। যারা বলে কম, শোনে বেশি!

ইলিশ মাছের দাম কমার পর নাহিদ সামর্থ্যরে সবটুকু দেখিয়ে দিল। বন্ধুদের সঙ্গে নদীপাড়ে গিয়ে সবাই কিনল একমণ করে মাছ। সেই মাছ ফ্রিজে ঢুকিয়ে ‘মৎস্যকন্যা’র সেলফি আপলোড করল সামিয়া- ‘কবি ঠিকই বলেছেন, মাছে-ভাতে বাঙালি!’ একদিন সত্যি সত্যিই স্টকের মাছের কাঁটা গলায় বিঁধল। শেষপর্যন্ত হাসপাতাল দৌড়াতে হলো। দেখে-শুনে চিকিৎসক বললেন, ‘আপাতত কিছুদিন সব ধরনের মাছ খাওয়া বন্ধ রাখুন!’
‘কিন্তু আমার ফ্রিজের মাছে রাজা ইলিশ?’

‘ফ্রিজটাও বন্ধ রাখুন। সঙ্গে মুখটাও!’
এমন ধারা প্রেসক্রিপশনে সামিয়া মাথা ঘুরে পড়ে জ্ঞান হারাল। বাধ্য হয়ে নাহিদকে উদ্যোগী হতে হলো সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের খোঁজে বেরোতে!