দুর্গন্ধের ফের

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯ | ৩ কার্তিক ১৪২৬

দুর্গন্ধের ফের

শফিক হাসান ৭:৩৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৭, ২০১৯

print
দুর্গন্ধের ফের

মস্তিষ্ক বৈকল্যসহ শারীরিক নানা সমস্যায় প্রায়ই গোলাম হোসেনকে ‘গোলামের পুত’ গালি শুনতে হয়েছে। বাবা পুত্রের ‘অপরাধ’ নিজের ঘাড়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, সইতে না পেরে টুপ করে ঝরে গেলেন একদিন! গোলাম হোসেনের মস্তিষ্কের সর্বাংশ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় প্রায়ই উল্টাপাল্টা করে ফেলে। বাইরে হাঁটাচলা শুরুর পর অন্যরা আবিষ্কার করল তার সত্য ভাষণের সামনে টেকা দায়! সত্য কথা অস্বস্তির কারণ না হলেও মুখ থেকে ভুরভুর করে যে দুর্গন্ধ বের হয় সেটা মেনে নেওয়া অনেকের জন্যই কষ্টকর।

ছেলের জন্য গোলামের মাকে এতদিন নানা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে; শেষপর্যন্ত সেটাই শাপেবর হয়ে দাঁড়াল। যে ছেলের মুখ খুললেই বের হয় পিয়াজের গন্ধ; পিয়াজের বাজার চড়া হওয়ার পর থেকে এ গন্ধই সবার জন্য কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠল। প্রায়ই এ-বাসা, ও-বাসায় ডাক পড়তে লাগল গোলামের।

প্রথম দিকে অপ্রত্যাশিত আদর আপ্যায়নের মানে বুঝতে না পারলেও এলাকার বাইরে থেকেও নিমন্ত্রণ আসা শুরু হলে খোলাসা হলো সব। পিয়াজ কিনতে ব্যর্থ গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীরাই কৌশলে গোলামের সঙ্গে কথা বলে বিকল্প উপায়ে চাহিদা মেটায়! গন্ধটুকু পায় এতেই তাদের স্বস্তি। গোলামকে সবাই যতটা বোকা ভেবেছিল দেখা গেল ততটা নয়। প্রত্যেক নিমন্ত্রণে আপ্যায়নের কার্যকাল ৫ মিনিট; এ জন্য তাকে দিতে হবে নগদ ১০ টাকা করে। এমন শর্তেও সেবাগ্রহিতাদের ভিড় কমেনি। পকেটের ব্যর্থতা যদি ১০ টাকায় ঢাকা যায়, পাওয়া যায় পিয়াজের অমৃত গন্ধ, সেটাই ভালো।

গোলামের ব্যবসা তুঙ্গে উঠলেও তার বড় ভাই সেলিম খেল রামধরা! গ্রাহক চাহিদা বুঝে বড় দাও মারবে এমন চিন্তায় দোকানে তুলেছিল মিয়ানমার থেকে আমদানিকৃত পিয়াজ। সেই পচা পিয়াজ আর বিক্রি হয় না। কম দামও আকৃষ্ট করল না গ্রাহকদের। চালান তো যাবেই, সঙ্গে ছালাটাও যাবে মনে হচ্ছে।

যে ছালার বস্তায় পিয়াজ রেখেছে সেলিম, পচা পিয়াজ সহজেই সেই ছালাকে ভিজিয়ে দিতে লাগল। ভেজা ছালা পচতে সময় নিল না। এদিকে তার নিয়মিত খদ্দেরদের সঙ্গে সৃষ্টি হলো মনোবৈকল্য। এদের কেউ কেউ সমালোচনা করে বললেন, যে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে নাস্তানাবুদ করছে, সেই দেশের পিয়াজ বিক্রি করিস কোন আক্কেলে?

সেলিম যতই উপর মহলের দোহাই দেওয়ার চেষ্টা করুক, তাদের এককথা- অত উপরে তো আমাদের দৌড় নেই, তোকে সামনে পাই; তুই-ই বল! সদুত্তর দিতে বারবারই ব্যর্থ সেলিম। এভাবে চলতে থাকলে চাট্টিবাট্টি গুছিয়ে তাকেই চাকরি খুঁজতে হবে অন্য কারও দোকানে! এর মধ্যে এক খদ্দের সওদা করতে এলে বাকিতেও পিয়াজ গছাতে পারল না সে। বাকি দিলে নেয় না এমন মানুষ কে দেখেছে কবে! সেলিম পায়নি একজনকেও। কৌতূহলে প্রশ্ন করার পর জানল তার ব্যবসার ১২টা বাজাচ্ছে ছোট ভাই গোলামই। সে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে-ফিরে অদ্ভুত উপায়ে হোম সার্ভিস দিচ্ছে!

ভাই হয়ে ভাইয়ের এত বড় সর্বনাশ কীভাবে করল! গোলামকে আপাতত ব্যবসা বন্ধ রাখতে বললে উল্টো ক্ষেপে যায়। তার ব্যবসায় কেন বাধা দেবে, সে তো সেলিমের ব্যবসায় কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি! সেলিম যুক্তি দিল, দাম কমলে যেন গোলাম আবার শুরু করে। এই ফাঁকে তার ব্যবসাটা চাঙ্গা হোক। এমন যুক্তিতে এক কেজি বাটা পিয়াজের ফ্লেভার ছড়িয়ে হাসল গোলাম- ‘দাম কমে গেলে আমার কাছে খদ্দের কেন আসবে?’

সেলিমও থমকাল প্রত্যুত্তরে- ‘তোকে আমরা বোকা ভাবতাম। তুই তো আসলে চালাকের বাপ; ভেক ধরে থাকিস!’
‘যার কাছে পিয়াজ থাকে সে কখনো বোকা হয় না!’

এমন জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যে সেলিম ভাবল, সেও যদি বিনা পুঁজির এমন পিয়াজের কারখানা পেত! তাহলে প্রতিদিনই হতো পিয়াজের দিন! এতদিন যে ভাইকে নিয়ে বিব্রত ছিল হঠাৎ তাকে নিয়েই ভীষণ গর্ব হলো সেলিমের। এমন ভাইধন ক’জনের আছে!

সেলিমের মা ইতিপূর্বে লোকজনকে বলতেন, তার এক ছেলে ব্যবসা করে, অন্য ছেলে আউলা। পিয়াজের ব্যবসা সম্প্রসারণের পর বলতে শুরু করলেন- দুই ছেলেই পিয়াজের আড়তদার; আয়-রোজগারও খারাপ না!