উপগল্প

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ | ৮ কার্তিক ১৪২৬

উপগল্প

শফিক হাসান ৯:৫৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯

print
উপগল্প

জনবল কম ফকিরাপুলের এমন একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলো বিশেষ সংবাদ শিরোনামের পাশে লেখা হলো ‘ভিডিওসহ’। সদ্য বেকার হওয়া যুবক জাহিদুর রহমান প্রতিদিনকার সংবাদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে। এ সংবাদটির কোথাও ভিডিও খুঁজে পেল না! ১ থেকে ৮ পৃষ্ঠার কোনাকাঞ্চিও বাদ রাখেনি। শেষমেশ সন্ধান জানতে অফিসে কল দিল। মোবাইল ফোনের ভেতরে থাকা আপা বারবার সবিনয়ে জানিয়ে দিলেন নম্বরটি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে না!

বিজ্ঞাপন বিভাগের নম্বরে কল দিয়ে অফিসের বড় কর্তার সন্ধান পাওয়া গেল। জাহিদের অফুরন্ত অবসর শুনে তিনি অফিসে যেতে বললেন। খুশিমনে দাওয়াত গ্রহণ করে সন্ধ্যা পেরোনো সময়ে পৌঁছাল জামিল ভাইয়ের কাছে। তিনি জাহিদকে চা-পানি খাইয়ে বললেন, অফিসে পার্টটাইম কাজ করতে। প্রথম কাজের বিষয় ‘মাস্টার চরিত’। একশ্রেণির শিক্ষক আজকাল ধর্ষণ, বহুবিবাহ, নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতির নানা ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাচ্ছেন। তুলে ধরতে হবে সাফল্য-চিত্র। যাদের দেখা পাওয়া কঠিন তাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বললেই হবে।

ভয়ে ভয়ে উত্তরপাড়ার বড় স্কুলের হেডমাস্টারকে কল দিল জাহিদ। নিজের পরিচয় দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- ‘স্যার, কী সব যেন বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন? শুভেচ্ছা, অভিনন্দন...!’

‘গুণীর কদর করতে হয় বুঝলে হে। তাদের কদর করলে তারাও আমার কদর বুঝবেন!’
‘অপ্রয়োজনীয় খাতে টাকা যাবে কার?’
‘দেশের টাকা! আমার পকেট থেকে দিলে সেটা যেমন দেশের, স্কুলের ফান্ড থেকে দিলেও দেশেরই!’
‘ফেসবুকে লোকজন যে নীতিকথার বিতর্ক তুলছে!’

‘না বুঝেই সমালোচনা করে। বড় আপা এখন বিদেশে। তুমি আমাকে জানাও কত কম টাকায় বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে দিতে পারবে! দেশে ফিরলে তাকে চমক দিতে চাই।’
বিজ্ঞাপন বিভাগের ফোন নম্বর দিলো জাহিদ। আত্মবিশ্বাস জন্মাল, কাজটা জলবত তরলং! এবার কাছের গ্রামপাড়ায় গেল। বিদ্রোহীদের ডিঙ্গিয়ে বড় আপার দেখা পেতে কষ্ট হলো। পরিচয় শুনে আপা যারপরনাই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ঈদের সময় এসে সালামি নিয়ে যেও!’

জিবে কামড় দিয়ে জাহিদ জানাল, সালামির কাঙাল নয়। আপা তিরস্কার করলেন তাকে- ‘কাঙাল না হলে বাঙালই থাকবে! বৈষয়িক হও, পরিবারের সদস্যদেরও সময়োপযোগী শিক্ষাটা দাও!’

আপার আশীর্বাদ নিয়ে সে পৌঁছালো দক্ষিণপাড়াস্থ দেশের সবচেয়ে বড় স্যারের কাছে। স্যার আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন, ‘বস। চা সিঙ্গারা চপ খাও।’ না-সূচক ভদ্রতায় বললেন, ‘সস্তা জিনিস দিয়ে আপ্যায়ন করছি বলে দ্বিধা করছ!’

‘তা হবে কেন! আপনার চেয়ারটা নিশ্চয়ই অনেক দামি?’
‘চেয়ার নয়, বিষয় হচ্ছে পদ। রাজা-বাদশারা সিংহাসনে বসতেন না? পদ বড় মানে ভালো চেয়ার!’
জাহিদের পড়াশোনার দৌড় প্রাইমারি পর্যন্ত শুনে আফসোস করলেন স্যার। বললেন, ‘একদিন রাতে এসো। বড় স্কুলে পড়ার চিঠি দিয়ে দেব।’
এর মধ্যে আবার দেশের সব স্কুলে উত্তাল পরিস্থিতি। মাস্টাররা স্কুল বন্ধ করে দেশে-বিদেশে ভ্রমণে বের হলেন। ছাত্ররা ছুটি না মেনে আঙিনায় সাইনবোর্ড টানাল- ধীরে চলুন, সামনে হেডমাস্টার!

অনুসন্ধানে জানা গেল, বড় বড় স্কুলের হেডমাস্টাররা ভুগছেন বিচিত্র রোগে। পূর্বপাড়ার স্যার ফেসবুকে কে কী লিখছে তীক্ষ্ণ নজর রাখেন। পড়াশোনা না করে ফেসবুকে সময় নষ্ট করার বিরোধী তিনি। তিরস্কারে কাজ না হলে বহিষ্কারও করেন। তাতেও কাজ না হলে বাপ-মা তুলে গালি দেন। মাথা ঠাণ্ডা করতে প্রতিদিন অর্ধলাখ টাকার চা খান!

একজন শিক্ষক স্কুলে বরাবরই অনুপস্থিত থাকেন। তাকে পেতে ১৭ দিন লাগল। অনুপস্থিতির প্রশ্নে হেসে বললেন, ‘আমার কি এখন প্রেমের বয়স আছে!’
‘প্রেম তো না, ফ্রেমওয়াক! অত বড় দায়িত্বে থেকে...।’

‘আমি দূরশিক্ষণ পদ্ধতির শিক্ষক। এটা রপ্ত করলেই হয়!’
এক শিক্ষক ছাত্রদের গালাগাল করেন। প্রশ্ন করা হলে বলেন, ‘গালি আমি দিমু না তো তুই হুমুন্দির পুত দিবি! ইতর, রাজাকার বললে ঊর্ধ্বতনরা বুঝবে আমার চেতনা অবিনশ^র!’ পশ্চিমপাড়ার বড় স্যার শুধু দুষ্ট পোলাপান পোষেন, অযোগ্য লোক এনে চাকরি দেন। কেন এমন- উত্তরে বলেন, ‘সবারই অর্থকরী কাজে মন দেওয়া উচিত। টাকা এনেছ? চাকরি দিয়ে দিই। পদটা শালার জন্য রেখেছিলাম; কিন্তু টাকা তো চাইতে পারব না। তুমিই নিয়ে নাও!’
পাড়ার মাতব্বর পাল্টালে এক স্যার গভীর রাতে স্কুলে প্রবেশ করেন পদ-পদবি বুঝে নিতে। বলেন, ‘এটা সার্বক্ষণিক পদ!’ পরে তাকে পাওয়া যায় সার্বক্ষণিক আনুগত্যের তৈলাক্ত মাঠে। তবে একটি জায়গায় সব স্যারের মিল- সততার সংজ্ঞা যার যার সুবিধামতো বানিয়ে নিয়েছেন; অনুগত বাহিনী সৃষ্টি করেছেন। বেকারত্ব দূরীকরণে রাখছেন বড় ভূমিকা! স্যারদের মধ্যে অমিলও কম নেই। পারস্পরিক দ্বন্দ্বে ছাত্রদের মাঠে নামানোর শিক্ষা দিতেও ভোলেন না। প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান অর্জনে ছাত্ররা যথার্থ শিক্ষিত হয়ে উঠছে! একদিন ঈষাণ কোণের স্কুলের শিক্ষককে জাহিদ বলে- ‘ক্যাসিনো সম্রাটদের মতো নেতা-নেত্রীর ছবির সঙ্গে পোস্টারে নিজের ছবি ছাপান না কেন!’

‘বুদ্ধিটা মন্দ দাওনি! আগামী সপ্তাহেই পোস্টার ছাপতে দেব। তার আগে ভালো ছবি তুলি!’
পরের মাসে নীলক্ষেত থেকে দরকারি কাগজপত্র বানিয়ে থিসিস নামানোর চিন্তায় উঠেপড়ে লাগল জাহিদ। যে কোনো মূল্যে স্কুলশিক্ষক হতে হবে। এতে লাভে লাভ, প্রতিদিন কাগজে ছবি ছাপা হবে, টেলিভিশনে দেখানো হবে। ছাত্ররা ক্ষণে ক্ষণে তার নাম জপবে! এত বড় প্রাপ্তির বিনিময়ে কিঞ্চিৎ গালমন্দ শোনা কিছুই না!