পর্দা আর বালিশে হাসে কার মালিশে

ঢাকা, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯ | ৮ কার্তিক ১৪২৬

পর্দা আর বালিশে হাসে কার মালিশে

আলম তালুকদার ১২:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯

print
পর্দা আর বালিশে হাসে কার মালিশে

বালিশ আর পর্দা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির সঙ্গে আরও অনেক প্রজাতি ছিল। মানুষের মতো তারা টিকে থাকতে পারেনি। তবে গরিলা, শিম্পাঞ্জি এখনো টিকে আছে। কিন্তু তারা মানুষের মতো ক্ষমতাবান নয়। অনেক কারণের মধ্যে ভাষা। মানুষের টিকে থাকার মধ্যে অন্যতম কারণ হলো ভাষা আবিষ্কার। তো ভাষা আবিষ্কারে কী লাভ? লাভ হলো নিজেকে প্রকাশ করতে পারা এবং অন্যকে বুঝতে পারা ও নিজেকে বোঝাতে পারা। সে অনেক লম্বা কাহিনী।

বলতে চাচ্ছি, ভাষা আবিষ্কারের ফলে যে বিষয়টা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, আড্ডা মারা। আড্ডা মারতে গিয়ে চাপামারা এবং বিভিন্ন মিথ সৃষ্টি করার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারা। যারা একটু বুদ্ধিমান, চালাক-চতুর তারা আজগুবি সব রূপকথা সৃষ্টি করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে দিতে পারত। আড্ডার প্রধান বিষয় ছিল, পরনিন্দা আর পরচর্চা। তাই অনেকে মনে করে মানুষের রক্তের মধ্যে আছে গল্প সৃষ্টি করা বা অভিনব ঘটনার জন্ম দেওয়া এবং সেই ঘটনা নিয়ে মাতামাতি করা।

বিশেষত, বাংলাদেশের মানুষ চায় নিত্যনতুন চাঞ্চল্যকর খবর। তাতে তাদের রক্ত চলাচলে সুবিধা হয়, অলস সময় খরচ করতে বেসুমার সুবিধা হয়। কী মজারু ব্যাপার, প্রায় প্রতিমাসে একটা করে আজব, আচানক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে আর বিভিন্ন মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে বিরাট হৈচৈ শুরু করে দিচ্ছে। ফেসবুক ওপেন করলেই এসব সচিত্র খবর চোখের সামনে খলবল খলবল করতে থাকে।

একবার এক দেশের রাজা হুকুম জারি করলেন, ঘুষ খাওয়া মন্দ, তাই খাওয়া বন্ধ!
দেখা গেল-
ঘুষ কর্মটা যেমন ছিল /তেমন ভাবেই আছে
ঘুষ না খেয়ে ঘুষের মানুষ/ কেমন করেই বাঁচে?

প্রিয় পাঠক বলেন, কেমন করিয়া বাঁচিবে? বাঁচিতে হইবেই এবং কিছু আকাম করিতেই হইবে বলিয়া অনেকেই এ অনিয়মের বা ঘুষের মোহজালে আবদ্ধ হইয়া যায়। এক রক্ত নেশা, মরণ নেশা! কমবেশি প্রায় সব মানুষ সুযোগ পেলেই এসব অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাবেই। অনেকের মতে এটা হোমো সেপিয়েন্সদের অমোঘ নিয়তি!

এতক্ষণে একটা জোকস কিলবিলাইছে! তখন সামন্ত প্রথা চলছে। মানে রাজা জমিদারদের শাসনকাল। এক চালাক-চতুর স্বশিক্ষিত চালবাজ গেল রাজ দরকারে। উজির সাহেবের পেছনে পেছনে ঘোরে আর বলে, ‘হুজুর, আমাকে একটা চাকরি দেন। চাকরি হলেই ঘি ভাত’। বেশ কয়েক মাস এ রকম করার পর, উজির ভাবলেন, চাকরি হলেই ঘি ভাত? কীভাবে? তিনি বেশ উৎসুক হয়ে তাকে রাজদরবারে হুক্কা সাজানোর চাকরি দিলেন।

লোকটি আনন্দের সঙ্গে তার কাজ শুরু করে দিল। কয়েকদিনের মধ্যেই উজির জানতে পারলেন, সে আসলেই ঘি ভাত খাচ্ছে! কীভাবে? জানা গেল সে যখন হুক্কা নিয়ে উজির এবং রাজার কাছে যায়, তখন তাদের হাতে হুক্কাটি দিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে আর বিড়বিড় করতে থাকে। বিচারপ্রার্থীরা এমনটা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করে- ভাইডি, পেছনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কী বলো?

-আরে আমি পেছন থেকে বিড়বিড় করে যা বলি রাজা উজির তাই হুকুম দেন।

ব্যস। ঘি ভাত ঠেকায় কে? তো ঘটনা জেনে উজির তাকে চাকরিচ্যুত করে দিলেন। আবার ঘ্যানর ঘ্যান। হুজুর একটা চাকরি দিলেই আমার ঘি ভাত। উজিরের মনেও একটা ভাব এলো। শালারে এমন এক চাকরি দিমু যাতে ঘি ভাত কেন পান্তা ভাত না জোটে। শেষে তাকে দেওয়া হলো ঢেউ গণনার চাকরি। সেখানেও ঘটনা ঘটিয়ে নৌপথে যারা বাণিজ্য করছিল তারা ধরা খেল।

তার কথা একটাই- ‘গুনতে নদীর ঢেউ বাধা দিল না কেউ’! রাজার হুকুম। তো ঘি ভাতের ব্যবস্থা হয়ে গেল। বাণিজ্যপথে বাধা। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেল। শেষে চাকরি নট। আবার ঘ্যানর ঘ্যান। একটা চাকরি দেন। চাকরি দিলেই ঘি ভাত। উজির এবার রাগ করে বলল, যা তুই রাজ্যের সব ইঁদুর মার। মনে মনে বলে- দেখি শালা এবার ঘি ভাত কেমনে কামাই করিস!

তো সে মহাখুশি হয়ে ইঁদুর মারতে শুরু করে। একশ’ লোক নিয়োগ দিয়ে দেশের আনাচে-কানাচে ইঁদুর মারার কাজে ব্যস্ত থাকে। দুই মাস পর প্রায় দুইশ’ লোকসহ উজিরের বাড়ি ঘেরাও করে। শাবল খোন্তা দিয়ে তার বাড়ির ওয়াল ভাঙতে থাকে। খবর পেয়ে উজির ছুটে আসেন- কী ব্যাপার, এখানে কেন?

-হুজুর, দুই মাসে দেশের প্রায় সব ইঁদুর মাইরা শেষ করছি। কিছু ইঁদুর বেঁচে আছে। তারা আপনার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। রাজার হুকুম ইঁদুর মারতে হবে। ...এই তোমরা বাড়ির ওয়াল দালানকোঠা ভেঙে ইঁদুর মারতে থাকো।

উজির দেখলেন সর্বনাশ! নিজে নিজের পায়ে কুড়াল মারছেন। একে তো ফেরানো যাবে না। রাজার হুকুম বলে কথা। তখন উজির তাকে গোপনে বললেন, ঠিক আছে। তোমার কথাই ঠিক চাকরি হলেই ঘি ভাত। আমি মেনে নিলাম। এই নাও কিছু দিলাম। নিয়ে সব লোক নিয়ে চলে যাও। তাই হলো। যায় আর বলে, কী হুজুর আমার কথা ঠিক হলো? চাকরি হলেই ঘি ভাত। ব্যতিক্রম বাদে মানুষ হলো সেই জাত। মানে না দিন কিংবা রাত। সবাই চায় আকাশের চাঁদ। ইমান নৈতিকতা সব বাদ। এ ভাবেই কি আমরা বালিশ আর পর্দা খেয়ে হয়ে যাব বরবাদ?