কমন রোগ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬

কমন রোগ

শফিক হাসান ১০:১২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

print
কমন রোগ

বাসস্ট্যান্ডের গনগনে রোদে দাঁড়িয়ে দরদর ঘামছিল রবিউল হোসেন, তীর্থের কাকের মতো প্রতীক্ষা একটি বাসের। বাস না এলেও কোত্থেকে যেন উড়ে এলো উটকো ঝামেলা। বছর বিশেক বয়সী এক ছেলে হাসি হাসি মুখে এগিয়ে এলো, ‘ভাইয়া, কেমন আছেন?’

গরমের চোটে এমনিতেই দিশেহারা অবস্থা; প্রশ্ন শুনে মেজাজ আরও তিরিক্ষি হলো- ‘কেমন আছি তা জেনে কী করবেন?’

‘না, মানে জানতে চাচ্ছিলাম আপা কেমন আছেন!’
‘আরেকজনের বউয়ের খবর জেনে কী কাজ?’

মেজাজ আরও চড়ল রবিউলের। আগন্তুক কথা বাড়ানোর সাহস করল না। ততক্ষণে ‘সড়কে বিমানের ছোঁয়া’ স্লোগান সংবলিত একটি বাস দাঁড়িয়েছে রবিউলের সামনেই। কপাল ভালো, উঠে পেয়ে গেল সিটও। রাতে বাসায় ফিরে টানা একঘণ্টা কলিং বেল বাজানো হলেও হেলদোল পাওয়া গেল না নূপুরের। কী করছে ভেতরে; ঘুমাচ্ছে নাকি! একপ্রকার হাল ছেড়ে দেওয়ার পর ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হলো। এসএমএস পাঠালো নূপুর- ‘দরজা খুলতে পারি এক শর্তে। কথা দাও, আর কোনোদিন বেয়াদবি করবে না?’

এটা কেমন উপদ্রব! আগ-পিছ না ভেবেই রবিউল ফিরতি এসএমএসে জানিয়ে দিল, শর্তে রাজি! তারপরই খুলল নূপুরের মনের এবং ঘরের দরোজা! ভেতরে ঢুকতেই হিংস্র বেড়ালের মতো খামচি দিল নূপুর- ‘আমার ভাইয়ের সঙ্গে এমন করলে কেন?’
‘কী যা তা বলছ? তোমার কোন ভাইয়ের সঙ্গে কী করেছি?’
‘ভুলে গেলে? বাসস্ট্যান্ডে অর্ণব তোমার সঙ্গে কথা বলেনি? কী বলেছ তাকে!’ তখনই বাসস্ট্যান্ডের আগন্তুককে শনাক্ত করতে পারল রবিউল। এ যে তার ছোট শ্যালক! কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। হলে থাকে। সপ্তাহে দুই একবার বোনকে দেখতে আসে। লজ্জিত হলো সে। আশ্চর্য, ওকে চেনাও মনে হয়নি। তাহলে অন্তত প্রশ্ন করতে পারত, ‘কে আপনি ভাই!’
নূপুরের ক্ষেপার কথাই। রবিউল বলল, ‘আসলে ওকে চিনতে পারিনি?’
‘কী, অর্ণবকে তুমি চেনো না! প্রতি সপ্তাহে যে বাসায় আসে!’
নুপূর যাচ্ছেতাই বলে বকাঝকা করে যাচ্ছে। এদিকে রবিউল ছিঁড়ছে নিজের কমে আসা চুল। আজকাল কী হয়েছে, চারপাশের লোকজনকে চিনতে পারছে না। কেউ যদি নিজের জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও যায়, সেখানে রবিউলের সঙ্গে দেখা হলে কুশলাদি বিনিময়ের চেষ্টা করে- অকূলে পড়ে সে। ব্যক্তি নিজ ঠিকানায় থাকলে চিনতে সমস্যা হয় না। গত সপ্তাহে ছুটির দিনে বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিউ মার্কেটে। রবিউল তাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি?’
‘চেনা যাচ্ছে না আমাকে?’
‘আসলেই না। কাইন্ডলি পরিচয়টা যদি দিতেন!’
‘তুমি দেখছি আচ্ছা বেয়াদব!’
সে রাতেই বাসায় ফিরে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ পেল রবিউল। নূপুর জানাল, রবিউল নাকি বাড়িওয়ালাকে অপমান করেছে শত শত মানুষের সামনে। এমন বীরত্বে খুশিই হয়েছে নূপুর, বাড়িওয়ালার প্রতি আগে থেকেই নাখোশ ছিল সে। একদিন ছাদে যাওয়ার চাবি চেয়েছিল, পায়নি। এ ঘটনা নূপুরের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনল। পরে নিজেই খুঁজে বের করল ছাদওয়ালা বাসা।
নতুন এলাকায় সবকিছু নতুন। সবার সঙ্গে পরিচিত হতে লাগল কয়েক মাস। একদিন সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় এক লোক সালাম দিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনার বাসা এখানেই?’

দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে রবিউল উত্তর দিল- ‘না, এখানে না। গাছতলায়!’ বাজারে যাচ্ছিল সে। কিছুক্ষণ পর বাজারে পৌঁছে দেখল যে লোককে অপমান করছে সে-ই দোকানদার। তার দোকানের বান্ধা কাস্টমার রবিউল। সিঁড়িতে উল্টাপাল্টা জবাব দেওয়া উচিত হয়নি! এভাবে প্রতিবেশী, দারোয়ান অনেকের সঙ্গেই ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে লাগল। সর্বশেষ গতকাল বাসার সামনে এক ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার বাসা এদিকেই? জানা ছিল না!’
‘কে আপনি? সবকিছু জানতে হবে কেন!’ অফিসে এসে চেহারা দেখে চেনা গেল বসকে! জিহ্বায় কামড় দিল সে। স্যরি বলার জন্য বসের রুমে গেলে বস জানালেন, রবিউল নামের কাউকে চেনেন না! সে বুঝল, এ সমস্যার সমাধান করতে হবে বসের বউকে দিয়ে। বাসা চেনে। আগামীকাল সকালেই চলে যাবে। সব শুনে নূপুর বসের বাসার পরিবর্তে তাকে নিয়ে গেল সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে। ডাক্তার বললেন, ‘কোথায় থাকেন?’
‘ঢাকায়। শেওড়াপাড়ায়।’
‘তাহলে তো ঠিকই আছে। এটা আপনার একার সমস্যা নয়, কমন রোগ। লাখ লাখ ঢাকাবাসী এ রোগে আক্রান্ত। এরা নিজেকে চেনে আয়নায়, অন্যদের বলতে গেলে চেনেই না!’
‘এখন আমি কী করব?’
‘আজ থেকে পরিচিত রিকশাওয়ালাদের খুঁজবেন। যাদের গাড়িতে ইতিপূর্বে চড়েছেন!’
‘আচ্ছা, তাই হবে। কিন্তু আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি?’
‘আপনার বাসায়! আপনার বাসা রাস্তার এ পাশের চারতলায়, আমারটা ওপাশের চারতলায়। প্রতিদিন বারান্দায় আপনি আমাকে দেখেন, আমিও আপনাকে। কথাও হয় টুকটাক!’