টকশো বিড়ম্বনা

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

টকশো বিড়ম্বনা

প্রিন্স আশরাফ ৪:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৯

print
টকশো বিড়ম্বনা

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে দীর্ঘদিন ফেসবুক গরম করে রাখলেও কারিম আফ্রাদের (বানানো নাম) কখনো কোনো টিভি মিডিয়া থেকে ডাক পড়েনি। যদিও ফেসবুকের নিজের টাইমলাইনে দুনিয়ার হেন বিষয় নেই যা নিয়ে নিজের জোরালো মতামত তুলে ধরতে সে কখনো দ্বিধা করেনি। তাকে ফলোয়ার বেড়েছে ঠিকই কিন্তু সে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে পারেনি। আর সেই আক্ষেপে যে ক’জন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টকে টিভি মিডিয়া নিয়মিত ডাকে তাদের সে ব্লক করে রেখেছে। কিন্তু আজ হঠাৎ একটা স্বনামধন্য বেসরকারি চ্যানেল সিক্সটিনাইন থেকে বিনীত স্বরে ভদ্রমহিলা কল করার পর থেকে তার দিনের ঘুম হারাম হয়ে গেছে!

টিভির টকশোতে যেসব অ্যাক্টিভিস্ট কথা বলতে যায় তারা কী ধরনের পোশাক পরে, কেমন করে কথা বলে, কোথা থেকে শুরু করে, কোথায় থামে এসব খুঁটিনাটি ব্যাপার ইউটিউব থেকে দেখে আত্মস্থ করার চেষ্টা করে কারিম আফ্রাদ।

একটা ব্যাপার একটু অদ্ভুত লেগেছে কারিম আফ্রাদের কাছে। সাধারণত টকশোগুলো মাঝরাতেই হয়, কিন্তু তাকে বিকাল চারটার আগেই স্টুডিওতে হাজির হতে বলেছে টিভি চ্যানেলের ব্যক্তিরা। টপিকও বলে দিয়েছে, ‘ডেঙ্গু না ডেঙ্গি? নামে কিবা আসে যায়!’

আজ টকশো অনুষ্ঠানে তার আমন্ত্রণের ঘোষণা কয়েক মিনিট পরপর দিয়ে ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনই শুধু গরম করে রাখল না, যেসব গ্রুপকে দেখে এতদিন কারিম আফ্রাদ বিরক্ত হতো সেগুলোতেও পোস্ট করতে দ্বিধা করল না। শুধু তাই নয়, সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, শুধু তাকেই নয়, তার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা পরিচিত কয়েকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, যারা কখনো কোনো টিভি চ্যানেলে গিয়েছে বলে সে দেখেনি, তাদেরও ওই একই চ্যানেল আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তাই দেখে নিজের গুরুত্ব হালকা হয়ে যাওয়ায় একটু মন খারাপ হলেও টিভি চ্যানেলে ডাকার আনন্দে মন খারাপ ভাব মুছে ফেলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটু ঝালিয়ে নিল।

উবার ডেকে ভাব ধরে টিভি চ্যানেলের সামনে এলো। লিফটে উঠে ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে ব্লক করা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মজদুর কামালের সাথে দেখা হলো। মজদুর কামাল অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে টিভি চ্যানেলগুলোর পরিচিত মুখ। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসাবে মজদুর কামালের ডাক পড়বেই। কারিম আফ্রাদকে দেখে মজদুর কামাল ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাকেও ডেকেছে? সবাইকে যদি ডাকে তাহলে আর আমাদের ডাকার দরকার কী?’ কারিম আফ্রাদের মুখে একটা শক্ত খারাপ কথা এসে গিয়েছিল, কিন্তু ভাবল এখনই মুখোমুখি না হয়ে ময়দানে মুখোমুখি হওয়াই ভালো, লাইভেই ফাটিয়ে দেবে সে। কারিম আফ্রাদ মধুর হেসে বলল, ‘একদিন না একদিন তো শুরু করতেই হয়!’

মজদুর কামাল ভুরু কুঁচকে রেখেই বলল, ‘একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, এই চ্যানেলের সব টকশোই রাত এগারোটার পরে শুরু হয়। আজ বিকেল বেলা দিল কেন? আপনি নতুন মানুষ, আপনাকে কিছু বলেছে?’

কারিম আফ্রাদ দুদিকে ঘাড় নাড়ল। লিফট চলে এলো চ্যানেলের ফ্লোরে এবং লিফট থেকে নেমেই দুজনেই হকচকিয়ে গেল।

লিফটেরও সামনে থেকেই ক্যামেরাম্যান লিফটের দরজার দিকে ক্যামেরা তাক করে রেখেছে। চ্যানেলের ফ্লোরের চারদিকেও ক্যামেরার চোখ, যেন ফ্লোরই স্টুডিও হয়ে উঠেছে! আর পরিচিত মুখ জনপ্রিয় উপস্থাপক মামুন ফরাজি বুম এগিয়ে ধরেই ধারা বর্ণনার ভঙ্গিতে বলতে লাগলেন, ‘আরো দুজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এসে গেছেন। তাদের হাতে ডেঙ্গু মশা নিধনের ফগার মেশিন তুলে দেবেন আমাদের পৌরপিতা ময়ূর রাশেদুল হক।’

ওরা দুজন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা উপস্থাপক ক্যামেরার মধ্যেই উপভোগ করতে করতে বললেন, ‘গোটা অনুষ্ঠানটাই আমরা লিফটের সামনে থেকে শুরু করে একেবারে ডেঙ্গু মশক নিধনের স্থল পর্যন্ত লাইভ করছি। মেয়র মহোদয় অনুষ্ঠান উদ্বোধন করার পর থেকে আমরা যেসব অনলাইন এক্টিভিস্টদের আজ এখানে ডেকেছি তারা সবাই হাজির হলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব ডেঙ্গু মশার আস্তানার খোঁজে।’

উপস্থাপক এবার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে গলা কাঁপিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘এতদিন আপনারা টকশোগুলো টিভির সেটের মধ্যে টকশোয়ের টেবিলে উপভোগ করেছেন। টকশোতে এসে আমাদের টকশোয়্যাররা পণ্ডিতি ফলিয়ে মুখে রাজা উজির মেরেছেন। তাতে আমাদের টিভি অনুষ্ঠানের কিছুটা চাংক মানে সময় ভরেছে বৈকি, কিন্তু সমাজের বিন্দুমাত্র উপকার হয়েছে বলে আমাদের জানা নেয়। তাই আমরা এবারে এই অভিনব পন্থা অবলম্বন করেছি। এখন থেকে মাঝে মাঝে বিনা নোটিসেই আমাদের টকশোর অনুষ্ঠানগুলো আর টকশোর টেবিলে সীমাবদ্ধ না হয়ে মাঠে ময়দানে হবে এবং তা শুধু আর কথার তুবড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, কাজে পরিণত হবে।

যারা এ বিষয়ে পণ্ডিত, কথা বলতে পছন্দ করেন, তারা নিশ্চয় সেই বিষয়গুলো সমন্ধে সম্যক অবগত থেকেই বলবেন, আর সে কারণেই আমরা চাইব টক শোয়াররা শুধু কথায় নয়, কাজেই বিশ্বাসী হবেন। আর এ কারণেই আজকে সব ক’জন টক শোয়ারকে নিয়ে আমরা ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধনে লেগে পড়ব। পুরো অনুষ্ঠানটাই লাইভ করছি, গোটা দেশবাসী আজ এখন আপনাদের এই কর্মকাণ্ড লাইভ দেখছে। কাজেই কারোর কোনো আপত্তি থাকলেও সেটা দেশব্যাপী জেনে যাবে এবং তখন হয়তো আপনাদের মুখে এক আর কাজে অন্যথা দেখে ছিছিক্কার পড়ে যাবে। আশা করি, আপনাদের কারোর কোনো আপত্তি নেই?’

কারিম আফ্রাদ আর মজদুর কামাল কাঁধে ফগার মেশিন তুলে নিতে নিতে দেখতে পেল মেয়র সাহেবের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাংশু মুখে জনাবিশেক টক শোয়ার দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার টিভি ক্যামেরার সামনে যাদের মুখে কথার খই ফোটে আজকে তাদের কারোর মুখে কোনো রাঁ নেই!