গুজবের গুজগুজানি

ঢাকা, রবিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৯ | ৩ ভাদ্র ১৪২৬

গুজবের গুজগুজানি

আলম তালুকদার ৪:৫৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০১৯

print
গুজবের গুজগুজানি

গুজব শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাঙালির সামনে যে পদার্থটির চিত্র ভেসে আসে তা কিছুতেই ইতিবাচক শব্দ নয়। বাংলা ‘গু’-এর সঙ্গে ইংরেজি ‘জব’ শব্দটি মিলে যে শব্দের সৃষ্টি হয় তা হল ‘গুজব’! ‘গু’ বিশেষ্যটির যে চরিত্র বা গুণাবলি তার বিশেষ কর্ম বা ‘জব’ যে নেতিবাচকই হবে তাতে আর সন্দেহ কি? সে কারণেই এটা যখন আসল জায়গা ছাড়া নির্গত হয় তখন সেটা অস্বাভাবিক বলে ধরা হবে। ‘গু’-এর সঙ্গে যে কর্ম তা হয় ‘গুজব’!

এ শব্দের ধর্মই হলো গিয়ে বাতাসের মধ্যে একটা খারাপ গন্ধযুক্ত কুখবর ছেড়ে দেওয়া! মুখরোচক, কর্ণরোচক এ নিয়ন্ত্রণহীন নিরীহ শব্দগুলো গুয়ের গন্ধের মতো গুলির চেয়ে দ্রুতগতিতে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। একবার শুনলেই ‘চিলে কান নিয়েছে’ এ গুজবের পেছনে ছুটতে থাকে। দৌড়াতে দৌড়াতে হয়রান হয়ে যখন কানে হাত দিয়ে দেখে তখন সে বুঝতে পারে, কান কানের জায়গায় আছে, শুধু সে নিজেই ঠিক জায়গায় নেই! এ রকম প্রচণ্ড শক্তিমান গুজব কালে কালে বিভিন্ন মহাদেশে আছে এবং ছিল। একটা জোকস না দিলে হয়? তাই দিলাম।

এক লোক অফিসে কাজ করছিল। হঠাৎ শুনতে পেল তার বাড়িতে আগুন লেগেছে। সে সব বাদ দিয়ে দৌড় দিলো। কিছু দূর গিয়ে শুনতে পেল, আগুনে তার বউ পোলাপান পুড়ে গেছে! সে আরও জোরে ছুটতে থাকে। তিন মাইল আসার পর হাঁফিয়ে গেল। একটু দাঁড়াল। হঠাৎ মনে হলো- আরে! আমি তো বিয়েই করিনি! বউ পোলাপান কেন থাকবে? সে বসে পড়ল। তারপর মনে হলো, আমার তো বাড়িও নেই! থাকি মেসে! ধ্যাৎতেরিকা! এ হলো কানকথা শোনার শাস্তি!

বর্তমান জগতে আমরা ‘ত্রিগু’ আতঙ্কে আছি। এই ত্রিগুয়ের কথা ওই বঙ্গের লেখক, চিত্রপরিচালক ও গীতিকার শচীন ভৌমিক তার ‘বেড সাইড শচীন ভৌমিক’ বইতে লিখেছেন। আমি টুকলিফাই করলাম। ত্রিগু হলো গিয়ে গুল, গুঞ্জন ও গুজব। প্রথমে এক গুলবাজ বা চাপাবাজ একটা বাজারে ছেড়ে দেবে। এটা নিয়ে শোনাউল্লারা গুঞ্জন শুরু করবে। ফিসফিস করে শ্রোতাদের বা সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করবে। তারপর এটা গুজবে রূপান্তরিত হয়ে প্রস্ফুটিত হতেই থাকবে হতেই থাকবে! ইংরেজি ‘রিউমার’ শব্দটির বাংলা করা হয়েছে ‘গুজব’। ‘উ’ মানে তুমি, আর ‘মার’ মানে মাইর দেওয়া। ‘উ’-এর আগে ‘রি’ মানে পুনরায় ‘উকে’ মাইর দাও। রি উ মার! তুমি একজনকে বা বহুজনকে মাইর দাও! কীসের দ্বারা? শব্দ দ্বারা, বা শব্দের দ্বারা! তো সেই মাইর লুকিয়ে থাকে ইংরেজি ‘রিউমার’ শব্দটির মধ্যে! এ বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে ‘রিউমার’ শব্দটির নাম সার্থক হয়েছে। বাংলা ‘গুজব’ নামটিও সার্থক হয়েছে। অনেক সময় এ গুজবেই গজব নিয়ে আসে। ইতোমধ্যে আমরা অনেক শুনেছি, জেনেছি। গুজবের গজব কত প্রকার ও কী কী! গুজব আর গজবের দূরত্ব শুধু একটা ‘উকার’!

ভাবতে অবাক লাগে বিজ্ঞানের চরম বিকাশের সময়ে আমরা আজো সেই মধ্যযুগের মনমানসিকতা নিয়ে বসবাস করে যাচ্ছি। ডিজিটাল সময়েও, নেটিজেন হয়েও আমরা সত্যমিথ্যা যাচাই না করেই হুজুগে মাতোয়ারা হচ্ছি। আমরা কবে আধুনিক হব, কবে মানুষ হব? আজকাল যখন একটা কুকুরেও বিয়োগ অঙ্ক করতে পারে, একটা ছোট্ট শিশুও ডিম পাড়তে পারে সেখানে ব্রিজ করতে মানুষের মাথা লাগে এ কথা বিশ্বাস করে কীভাবে? এ কথা শুনে আমাদের পোষা বিড়াল গোস্যা করে আমাদের চিরদিনের জন্য এতিম করে চলেই গেল! একটু জায়গা যখন আছে, একটা ধাঁধা দিয়ে শেষ করি। আসলে গুজব রম্য জমিতেছে না! ‘কাটলে বেরোয় না রক্ত, কাটাও নয় শক্ত। কাটি আমি যতবার, জোড়া লাগে ততবার’। এ জিনিসটার নাম কী?