দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির মতিগতি

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির মতিগতি

আলম তালুকদার ১:১৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০১৯

print
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির মতিগতি

যে পাতার নাম বাংলাওয়াশ মানে ‘ধবল ধোলাই’ সে পাতায় কোনো মাইয়া-পোলাই সিরিয়াস কথা প্রত্যাশা করে না। কাজেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতির কারণ নিরূপণে প্রথমেই আমরা যুক্তিবিদ্যার ফ্যালাসির আলোকে বিবেচনা করে দেখি কেন বছর বছর জিনিসের দাম সরকার বা বেসরকার বাড়াতেই থাকে।

দর্শনের এক শিক্ষক ক্লাসে ফ্যালাসি বোঝাচ্ছেন তোমার বাড়িতে পুকুর আছে। সেই পুকুরে তুমি গোসল করো, মাছ মারো। তার মানে তুমি পানি ভালোবাসো।

এমন যুক্তি শুনে বল্টু বলল স্যার, আপনি পানি পান করেন, আমিও পানি পান করি, আপনার মেয়েও পানি পান করে। তার মানে আমি পানি ভালোবাসি, আপনার মেয়েও পানি ভালোবাসে। অতএব আপনার মেয়ে আমাকে ভালোবাসে, আমি তাকে ভালোবাসি!

ক্লাসে কী হয়েছিল তা আর বলতে হবে? তো সেই যুক্তিতে যদি বলা হয়, আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস চাই। সরকারের লোকজনও চায়। তারাও বাজার থেকে কিনে খায়, আমরাও বাজার হতে কিনে খাই। তারা যা পছন্দ করে আমরাও তাই পছন্দ করে থাকি। সরকার জনগণকে ভালোবাসে, জনগণও সরকারকে ভালোবাসে, এতএব সরকারের সিদ্ধান্তকে আমরা পছন্দ করি। ঊর্ধগতিকে সরকার পছন্দ করেছে, সুতরাং আমরাও! কী যুক্তি ঠিক আছে?

এই রে, মারছে! জোকস যে আরেকটা ফাল পাড়ছে? খালাস করে অন্য প্যাঁচাল।

এক ব্যবসায়ী তার স্ত্রীকে একা বাসায় রেখে ব্যবসার কাজে ঢাকা থেকে রাজশাহী-খুলনা দৌড়াদৌড়ি করে থাকেন। একবার সাতদিনের জন্য বেরিয়েছেন। বের হওয়ার তিন দিনের মধ্যে হঠাৎ বাসায় হাজির। হাজির হয়ে যা দেখলেন তাতে বউ তালাকের সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্বশুরকে আসতে বলল।

শ্বশুর বলল, বাবা আগেই তালাক দিও না। আমার মেয়ে কোনো যুক্তি ছাড়া কাজ করে না! তিনি মেয়েকে এইরূপ করার কারণ কী জানতে চাইলেন। জবাবে মেয়েটি খুব সহজভাবে বলল, ‘দেখ তোমার জামাইয়ের আক্কেল! সে আসার কথা আরও চারদিন পর, তা না এসে, সে করল কী? হঠাৎ করে কিছু না জানিয়েই চলে এসেছে! যেদিন আসার কথা সেদিন এলে তো আমাকে এ অবস্থায় ধরতে পারত না! তাই না বাবা?’

বাবা কন্যার কথা শুনে হাসি হাসি ভাব নিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে আগেই বলেছি না, ও কোনো যুক্তি ছাড়া কাজ করে না’! হা হা হা!

আমরা যে যাই বলি না কেন, সরকার বা ব্যবসায়ীরা কোনো যুক্তি ছাড়াই জিনিসপত্রের দাম কিছুতেই বাড়ায় না! আসুন এবার আলোচনা করি কী কী যুক্তি লুকিয়ে আছে। প্রথম যুক্তি। চাহিদা বাড়ছে, দাম বাড়ছে। দ্বিতীয়, হাইরাইজ বিল্ডিং! দুইতলা তিনতলা রাস্তা নির্মাণ। তৃতীয়, আয়ও বাড়ছে, অবৈধ? সেটাও বাড়ছে! রেমিট্যান্স বাড়ছে। জনসংখ্যাও বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ছে, পত্রিকার সংখ্যা বাড়ছে, সাংবাদিক বাড়ছে. মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ছে! ভুয়াদের সংখ্যা বাড়ছে। কারও কারও গাড়ি বাড়ি বাড়ছে। ঋণখেলাপি বাড়ছে। সরকারি দফতরে প্রমোশন বাড়ছে। উন্নয়নের জোয়ার বাড়ছে। বিদেশ ভ্রমণ বাড়ছে। খেটেখাওয়া মানুষের মজুরি বাড়ছে। রিকশা বাড়ছে। যাত্রী বাড়ছে। হাসপাতাল বাড়ছে, ডাক্তার বাড়ছে, রোগী বাড়ছে, দোকানপাট বাড়ছে, কবি-সাহিত্যিক বাড়ছে, প্রতিবছর হাজার হাজার বই বাড়ছে! সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ও বাড়ছে। চারদিকে বাড়ছে বাড়ছে রব আর কলরব! সর্বোপরি আমাদের ব্যয়ও বাড়ছে। এমনকি গড় আয়ুও বাড়ছে। আরও আছে মাস্তান সন্ত্রাসী ধর্ষক বাড়ছে, দুর্নীতি বাড়ছে, মামলা বাড়ছে, উকিল বাড়ছে, মক্কেল বাড়ছে, নেতা বাড়ছে, তদবির বাড়ছে। অবসরপ্রাপ্তদের সংখ্যা বাড়ছে। উৎপাদন বাড়ছে! মানুষের মতলব, স্বপ্ন ও আশাও দ্রুত বাড়ছে! এ বাড়াবাড়ির স্রোতে দ্রব্যমূল্যও বাড়ছে। অতএব আমাদের সবারই কিছু না কিছু বাড়ছে! ফ্যালাসি তাই বলে। সুতরাং হাউমাউকাউ জিনিসের মূল্য বৃদ্ধি পাউ! কেন কেন করার কোনোই অকাট্য যুক্তি নাই!

আমার মনে হয় গ্যাসের দাম বাড়ানোর তেমন যুক্তি নেই। অন্তত ফ্যালাসি তা বলে না! কারণ দেশে ভেজাল খেয়ে খাদকের পেটে যে পরিমাণে গ্যাস উৎপাদন হয় তাতে বায়বীয় গ্যাসের দাম বাড়ানোটা একেবারেই অযৌক্তিক! কীভাবে? সরকার অনেক ডিজিটাল। তাদের সিদ্ধান্ত ও কাজকামও ডিজিটাল। যদি বাড়িতে বাড়িতে এমন একটা যন্ত্র সরবরাহ করা যায়, যে যন্ত্রটা গ্যাস বের হওয়ার স্থানে সংযোগ ঘটিয়ে চুলার সঙ্গে সংযুক্ত করে দিলে বিনা টাকায় গ্যাসের চাহিদা মিটে যাবে। প্রয়োজনে পেটে গ্যাস উৎপাদনের জন্য বাসিপচা খাবে বা কোনো ট্যাবলেট খাবে! এখন শুধু একটা লাগসই যন্ত্র আবিষ্কার। বাঙালির বিশেষত ধোলাইখালের প্রকৌশলীরা একটু সহযোগিতা করলে এ অর্থবছরেই এর সমাধান হতে পারে! তাতে দুইটা লাভ। প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত বাড়বে এবং পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে! অন্তত একটা দ্রব্যের মূল্যহ্রাস পাবে! তাতেই বা কম কী?