জ্বালানির জ্বলুনি

ঢাকা, রবিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ | ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

জ্বালানির জ্বলুনি

শফিক হাসান ১:০৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০১৯

print
জ্বালানির জ্বলুনি

জরিনা ভবনে সকাল থেকেই বিরাট শোরগোল! ছয়তলার ভবনের অনেক বাসিন্দাই নেমে এসেছে নিচে। ক্ষোভ একটাই হঠাৎ কেন গ্যাসের দাম বাড়ল! গত মাসে না বাসা ভাড়া বাড়াল জরিনার বাপ! তারও ছয় মাস আগে যখন ভাড়া বাড়ানো হলো, জরিনা ভবনের মালিক জমির হোসেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আগামী এক বছরে ভাড়া বাড়বে না। ভবনের অধিকাংশ বাসিন্দা ছোট চাকুরে কিংবা ব্যবসায়ী। নুন আনতে পান্তা ফুরায় না সত্য, কিন্তু খাদ্যের প্রায়ই আমিষের ঘাটতি থাকে!

গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে বাড়িওয়ালার কিছুই করার থাকে না। সরকারি বিষয়-আশয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগও নেই। জরিনা ভবনের সবচেয়ে পুরনো ভাড়াটিয়া আবুল সাহেব সকালে খবরটা পেয়ে সংগঠিত করেছেন সব ফ্লোরের কর্তাকে। তারপর কল দেওয়া হলো জমির হোসেনকে। অন্য বাড়িওয়ালার মতো তিনি নিজ বাড়িতে থাকেন না।

অভিজাত এলাকার অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। তার একটা স্ট্যাটাস আছে।

গ্যারেজে বসে সবার সামনে স্পিকার বাজিয়ে কল দেওয়া হলো জমির সাহেবকে। কথা বললেন সাত বছরের পুরনো বাসিন্দা মুখপাত্র আবুল মহলানবিস। তার যুক্তি গত মাসে বাসা ভাড়া বাড়ানো হলো, এ মাসে কেন গ্যাসের দাম বাড়বে? টাকা কি আকাশ থেকে পড়ে!

জরিনার সঙ্গে খুনসুটির সময় কল আসায় এমনিতেই মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল জমির হোসেনের। বেহুদা যুক্তি শুনে মেজাজ চড়ল আরও ‘সরকার গ্যাস ভাড়া বাড়িয়েছে, আমি কী করতে পারি? আমি তো শুধু বাসা ভাড়ার মালিক!’

ঠাণ্ডা গলায় আবুল বললেন, ‘আপনাকে কিছুই করতে হবে না। গ্যাসের বিল যে ১৭৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে টাকাটা আমরা বাসা ভাড়া থেকে কেটে রাখব। প্রতি মাসে সরকারি-বেসরকারি মূল্যবৃদ্ধির বোঝা বইতে পারব না। আমরা কোনো লুটপাটের টাকার ভাগ পাই না।’

‘মগের মুল্লুক নাকি!’

‘জগ-মগ বুঝি না। যার যার বাসা ভাড়া থেকে গ্যাসের বাড়তি বিল কেটে রাখা হবে। অন্যদের সঙ্গে কথা বলেন।’

নিচতলার বাসিন্দা তহুরা বেগমের সঙ্গে দ্বিতীয় বাক্য বিনিময়েই কল কেটে দিলেন জমির হোসেন। কিছুক্ষণ ভাড়াটিয়াদের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তে গালমন্দ করলেন, তারপর গ্যাস কর্মকর্তাদের অভিশাপ দিলেন। এমনিতেই উপযুক্ত বাসা ভাড়া পাওয়া যায় না। ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খিটিমিটি লেগেই থাকে। সমস্যার সমাধান না হওয়ায় জরিনা ভবনের নেমপ্লেটে দীর্ঘক্ষণ জুতাপেটা করল বিক্ষুব্ধ ভাড়াটিয়ারা। তারপর আবুলের বুদ্ধিতে তৃতীয়তলার চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইশাকে ডেকে আনা হলো। সে কাগজে এঁকে দিল জমির হোসেনের ছবি। সে ছবিতেও ইচ্ছা অনুযায়ী জুতানো হলো। শেষমেশ থুতু দিয়ে বারোটা বাজিয়ে ফেলা হলো প্রতিকৃতির।

কিছুক্ষণ পর হুঁশে ফিরল সবাই। এসব করে কী লাভ! আগামী মাসে ভাড়া নেওয়ার সময় জমির হোসেন ঠিকই জানিয়ে দেবেন কে থাকবেন, কে যাবেন জানি না; ভাড়া একপয়সাও কমানো যাবে না। রূঢ় আচরণে ৯৯৯ নম্বরের হেল্প লাইনে কল করেও লাভ হবে না। বাড়িওয়ালাদের মাস্তানিসুলভ আচরণ সরকার স্বীকৃত! সময়োপযোগী বুদ্ধি আসতেও দেরি হলো না। দুই তলার বাতেন সাহেব পরামর্শ দিলেন, ভবনে ১২টা ইউনিট রয়েছে। আমরা শুধু দুইটা চুলা রাখতে পারি। নিচতলায় ও তৃতীয় তলায়। যার যার সুবিধামতো দিনভর কিস্তিতে রান্না হবে। বুদ্ধিটা মনে ধরল সবার। বউরা ঘাইঘুই করলেও স্বামীদের হিসাবি মনোভাবে পাত্তা পেল না। কয়েকদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রান্নাবান্না ভালোই চলছিল। এ ভালোর ভেতরে ভালোবাসার অনুপ্রবেশে ঝামেলা পাকাল। দুইতলার মিজান সাহেবের সঙ্গে বাতেন সাহেবের বউ ভেগে গেছে শুভ দিনক্ষণ দেখে। বউ অসুস্থ বলে বাতেন নিজেই রান্না করতে যেতেন। তেল-নুন ভাগাভাগি করতে করতে একপর্যায়ে মনের সঙ্গে মনও মিশিয়ে দিলেন দুজনা। ঘরত্যাগী হওয়ার আগে গভীর রাতে তিনতলা থেকে গ্যাসের চুলাটা খুলে নিয়েছেন মিজান সাহেবের পরকীয়া প্রেমিকা। সমস্যা বাধল অনেকের। রান্নাবান্নার ব্যাঘাতে মুখরা এক ভাবী বলে উঠলেন, ফকিন্নি স্বভাব রাইখা কীভাবে প্রেম করলি!

এক চুলা কমায় খুশিও হলো কেউ কেউ। যাক, গ্যাসের খরচ আরও কমবে। দাম বাড়িয়ে এ বাসায় পক্ষান্তরে কমিয়েই দেওয়া হয়েছে! নিচতলায় জটলা বাড়লে একদিন রাতের অন্ধকারে কেউ একজন বলল এইবার কার জামাই লইয়া কার বউ লইয়া ভাগব? কে হইব সেই সৌভাগ্যবান পুরুষ!