দিবা-নিশিকুটুম্ব

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

দিবা-নিশিকুটুম্ব

শফিক হাসান ২:২৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০১৯

print
দিবা-নিশিকুটুম্ব

একদিকে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের প্রসার, অন্যদিকে ইমিটেশনের জনপ্রিয়তা দুটোই মঞ্জুর ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিসাবি পুরুষদের কাছ থেকে যেমন সে বঞ্চিত হয়েছে, গহনাপ্রেমী নারীদের রুচির নিম্নগামিতাও ফেলেছে আরও বড় বিপদে। পণ্যে ভেজালের প্রাদুর্ভাবও কম ভোগায়নি। পেশাগত জীবনের শুরুতে ছিল সিঁধেল চোর। গ্রামের বেশিরভাগ বাড়িই মাটির, গভীর রাতে মাটি কেটে প্রবেশ করতে হতো ভেতরে। ঘরের কোথায় থাকতে পারে কাক্সিক্ষত বস্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বোঝা হয়ে গিয়েছিল মঞ্জুর। মোটামুটি পাঁচ মিনিটেই প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো করায়ত্ত করে সটকে পড়ত। সতর্কতা হিসেবে সারা গায়ে মাখত খাঁটি সর্ষের তেল। যাতে ধরা পড়লে পিছলে বেরিয়ে আসতে পারে।

কথায় আছে, দশদিন চোরের একদিন গেরস্থের। শত শত চুরি করে যখন প্রবাদটির অসারতা প্রমাণ করে যাচ্ছিল মঞ্জু, এমন সময়ই ঘটল ঘটনাটা। সেদিনও সিঁধ কেটে বড় দাঁও মেরেছিল। বেরিয়ে হাঁটা দিতেই মূর্তিমান আতঙ্ক! গ্রামের মানুষ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয় বাইরেই। কে একজন কাজ সেরে ফিরছিল, সে-ই সামনাসামনি হয়ে গেল। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মৃদু আলোয় আঁচ করতে পেরেছিল ঘটনা কী। তৎক্ষণাৎ দু’হাতে ঝাপটে ধরল। একজন বলে মঞ্জু ঘাবড়াল না। ছুটে বেরোনোর চেষ্টা করল। কী আশ্চর্য, শর্ষের তেল কাজ করল না। তেল-ভেজা শরীরেই লোকটি অনায়াসে ধরে রাখল তাকে। শুরু করল চিল-চিৎকার ‘চোর আইছে রে, সবাই বাইরে আয়!’ প্রাণান্তকর চেষ্টা করল মঞ্জু। শর্ষের তেলের তেজই নেই! মনে মনে মুদি দোকানির মু-ুপাত করল সে। শালা, দুই নম্বর তেল গছিয়ে দিয়েছে; নইলে কি এভাবে বমাল ধরা পড়তে হতো!

হারিকেন-কুপির সংখ্যা বাড়ল মানুষের সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। একজন মাটির চুলা থেকে ছাই এনে গায়ে ছুঁড়ে মারল। তুষের ছাইয়ের আগুনের উত্তাপ পুরোপুরি মরেনি। গায়ে যেন ফোসকা পড়ল মঞ্জুর। ছাইয়ের প্রয়োজন ছিল না। এত মানুষের মধ্যে সে পালাবে কীভাবে! ছাই ছিটানোর বুদ্ধি বোধহয় অপরিপক্ব কারোর! গরুর দড়ি দিয়ে হাত-পা বাঁধা হলো। অন্ধকারেই কে যেন কষে লাথি মেরে শুইয়ে দিলো তাকে। আরও মারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে দেখল, খুব সুন্দর একটি গাড়ি কিনেছে সে। গাড়িতে চড়েই চুরি করতে যায়। আশপাশে থাকে অনেক লোক। এরা চুরিতে সহায়তা করে। তবে চুরি শেষে একাই ফেরে নিজ বাড়িতে। অনিন্দ্যসুন্দরী এক তরুণী এগিয়ে এসে চুরিকৃত মালগুলো বুঝে নেয়। মঞ্জু বলে বউ, তোর লাইগা আনলাম...!

ভোর হতেই পুরো গ্রামেই শুরু হলো উৎসবের আমেজ। এ-পাড়া ও-পাড়া থেকে দলে দলে ছেলে-বুড়ো আসতে শুরু করল চোর দেখতে। জনস্রোতের যে ছেলেমেয়েরা কখনও চোর দেখেনি তারা মন্তব্য করল চোর কই, এটা তো মানুষ! আগে-পরে যাদের ঘরে চুরি হয়েছে, পকেট কাটা গেছে লোকাল বাসে হাত-পায়ের সুখ মেটাল। ভোরে তীব্র হল্লায় ভেঙেছে মঞ্জু চোরের ঘুম। স্বপ্ন দেখা সুন্দরীর মুখের ছায়াটুকুও মনে পড়ল না! এর মধ্যেই শুরু হলো বেদম মার। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো সে। তার কঁকানোর শব্দ ছাপিয়ে গেল চোর পাকড়াও করা হারুনের বাবার চিৎকারে ইয়া মাবুদ, এটা আমি কী করলাম?

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, চোর চুরি করেছে তারই চিরশত্রু প্রতিবেশীর ঘরে। যে কোনও মূল্যে এ পরিবারের ক্ষতিই চায় সে। এমনকি কেউ যদি শর্ত দেয়, তার এক কান কাটার বিনিময়ে ওই পরিবারের কারও দুই কান কাটা হবে তাতেও একপায়ে খাড়া! শেষপর্যন্ত তারই মধ্যস্থতায় ছাড়ায় পেল মঞ্জু। সহানুভূতি আদায় করল সহৃদয় উপস্থিতির গরিব মানুষ বলেই তো চুরি করেছে, নইলে কি করত!

অবস্থা বেগতিক দেখে ধীরে ধীরে সিঁধ কাটা বাদ দিলো মঞ্জু। মানুষ এখন ব্যাংকমুখী, চেক-এটিএম কার্ড ব্যবহার করে। মহিলারা সোনার বদলে ব্যবহার করে সত্যিকারের ইমিটেশন! লোকসানি খাতে আর চলছে না। আরও বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে, শহরে-গঞ্জে-বিদেশে গিয়ে অনেকেই টাকা বানিয়েছে। তারপর বেড়ার ঘর, মাটির ঘরগুলো বিল্ডিংয়ে রূপান্তরিত হতে শুরু করল। ব্যবসা খারাপ হতে শুরু করলে একদিন কে যেন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্তব্য করল চোরে-পুলিশে মাসতুতো ভাই!

কথাটা মনে ধরল তার। তারপর থেকে পুলিশের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে যৌথভাবে কাজ করে। যে কাজই করে, সহযোগী পুলিশদের সমর্থন নেয় আগে। ঝামেলা হলে যাতে মিটমাট করা যায়। রাতের পর তার দিন এসেছে; এখন সে দীনও হয়! টাকাপয়সা জমুক, সব ছেড়ে নাম লেখাবে দীনের পথে। এখন আর গায়ে তেল মাখার কষ্টসাধ্য কাজ করতে হয় না তাকে। ভদ্রলোকের পোশাক পরে দিব্যি ঘুরে বেড়ায়!