ঘুষখোরের ঘাস ভক্ষণ

ঢাকা, সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

ঘুষখোরের ঘাস ভক্ষণ

শফিক হাসান ১:৪৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০১৯

print
ঘুষখোরের ঘাস ভক্ষণ

অফিসে যেদিন থেকে ঘুষ নিবারণ করি (ঘুনিক) সংস্থার আনুষ্ঠানিক সিল পড়লো, সেদিন থেকেই রেট বেড়েছে! যারা জানতো না, ঘুষের বিনিময়ে চাকরি দেওয়াসহ আনুষঙ্গিক সেবা দেওয়া হয় তারাও জেনে গেলো। এতে বড়কর্তা হিসেবে মোতাহার হোসেনের আয়-উন্নতি বেড়েছে, সম্মানও বাড়ছে শনৈ শনৈ।

আরও বিভিন্ন অফিসে ঘুনিক সেঁটেছে বিশেষ স্টিকার যদি ঘুষ খাই তবে ঘাস খাই! অফিসের অন্যরা ‘আপ্তবাক্য’ বানিয়েছে, ঘুষ খাই তো ঘাস খাই! প্রতিদিন চেয়ারে বসেই মোতাহার হোসেন ‘সতর্কবাণী’টির দিকে তাকিয়ে মনে মনে হাসেন। নোটিস দিয়ে কি ঘুষ বন্ধ হয়! উল্টো বিষয়টি বিজ্ঞাপনের কাজ করেছে। নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, শহরের যত্রতত্র প্রস্রাব বন্ধে আরবি বাক্য লেখানো হয়েছে দেয়ালে দেয়ালে। তাই বলে ফুটপাত ভাসানো থামেনি। বাস্তবতা নীতিকথা মানে না। যে কারণে লোকাল বাসের ‘পকেট সাবধান’ লেখা উপকার দেয় না। বর্তমানে ‘নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৯টি আসন’ লেখাও জবরদখল থামাতে পারে না।

আজ সকালে অফিসে বসে যথারীতি মন্ত্রটা আওড়ালেন ঘুষ খাই তো ঘাস খাই! ততক্ষণে পিয়ন এসে জানালো ‘পার্টি এসেছে’। চাকরি লাগবে। এ অফিসে নিয়োগ দেওয়া হবে। পত্রিকাগুলোতে ছাপা হয়েছে বিজ্ঞাপন। ইন্টারভিউর দেরি থাকলেও যোগাযোগ শুরু করেছে তদবিরবাজরা। ভালোই হলো, সকালেই মক্কেল জুটেছে। আদিষ্ট পিয়ন হাজির করলো চাকরিপ্রার্থীকে। একা আসেনি, অভিভাবকও এনেছে। মোতাহার হোসেন অভিজ্ঞতায় জানেন, বেকার ছেলেদের টাকা থাকে না। ঘুষ লেনদেনে তাই অভিভাবককে সঙ্গে রাখে। তারাও না দেখে-বুঝে টাকা ছাড়তে চান না। সামনে বসা ছেলেটির চেহারা থেকে ছাত্র ভাবটা এখনও কাটেনি। সঙ্গের লোকটি নিশ্চয়ই তার বাবা। চেহারা ও পোশাক বলছে কৃষক পরিবার। বিধ্বস্ত চেহারা এও বলছে ছেলের হাতে সংসারের ভার দিয়ে স্বস্তি পেতে চান।

মোতাহার হোসেন ডাইরেক্ট অ্যাকশনে বিশ্বাসী। অভিভাবককে বললেন, ‘চাকরির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। ১০ লাখ টাকা দিতে হবে অগ্রিম। বাকি বা কিস্তির হিসাব নেই।’

শুনে আর্তনাদ করে উঠলেন প্রৌঢ় ‘ছার, এত্তডি টাকা কই পামু?’

বিরক্ত হলেন মোতাহার হোসেন। অনেকেই এখানটায় এমন করে। এবারও কথা বাড়ালেন না ‘টাকা আপনার কাছেই থাকুক। আমার কাছে কেন এসেছেন!’

চাকরিপ্রার্থী তরুণ প্রতিশ্রুতি দিলো বাবাকে বুঝিয়ে শিগগিরই টাকা আনবে সে। বাস্তববাদী বাবা প্রতিক্রিয়া জানালেন তাৎক্ষণিক ‘জমি বেইচা যদি ঘুষের টাকা দেস, তোরা খাবি কী?’

এদের বিদায়ের পর এলো নতুন ঝামেলা। এক ছেলেকে চাকরি দেবেন বলে ঘুষ নিয়েছিলেন। সব ঠিকঠাকই ছিলো, মাঝখানে বাগড়া দিলেন মন্ত্রী। নিজের একজন প্রার্থী বসিয়ে দিলেন এখানটায়। কত টাকায় রফা করেছেন জেনে লাভ হতো না। উল্টো নিজেরই দশ লাখ টাকা লস! ওই ছেলে টাকা ফেরত নিতে নাছোড়বান্দার মতো লেগে আছে। পিয়নের বাধা অগ্রাহ্য করে রুমে ঢুকে পড়লো সে। মোতাহার হোসেন বললেন ‘ভেতরে এলে কেন? বলেছি না প্রসেস হচ্ছে। দুই লাখ টাকা বাদ দিয়ে সব টাকাই ফেরত পাবে।’
ক্ষুব্ধ তরুণ বললো, ‘আমি নিতে আসিনি স্যার, দিতে এসেছি।’
রাগ পরিণ হলো বিস্ময়ে ‘কী দেবে...?’

কথা বলা অবস্থায় মোতাহার হোসেনের হাঁ করা মুখে ঢুকে গেলো একদলা গোবর। গোবর ছুঁড়ে মারা হতাশ চাকরিপ্রার্থী বললো, ‘গঞ্জে পান-বিড়ির দোকান দেবো। তবু আপনার মতো দুই নম্বর লোকের পেছনে আর ঘুরবো না। আজ আপনার উপযুক্ত খাদ্য গোবর নিয়ে এসেছি। পেটভরে খাওয়াবো। ঘুষ আর গোবর এক জিনিসই!’

মুখে গোবর পোরা থাকায় পিয়নকে ডাকতে পারলেন না মোতাহার হোসেন। এর মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় গোবর নিক্ষেপ করে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো তরুণ।

যাবে কোথায়, সিভি জমা আছে! মোতাহার হোসেন সিদ্ধান্ত নিলেন একজন সৎ কর্মকর্তাকে ঘুষ সাধার কথা জানিয়ে গোবর লেপনকারীর বিরুদ্ধে ঘুনিকে অভিযোগ করবেন!