বাঁশ উঠেছে ওই

ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১ আশ্বিন ১৪২৬

বাঁশ উঠেছে ওই

শফিক হাসান ১:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৯

print
বাঁশ উঠেছে ওই

সূর্যের খরতাপ নিয়ে চাঁদ এসেছে রাফাতের দৈনন্দিন ভুবনে। যে চাঁদ সবাইকে দেয় রোমান্টিকতায় ভাসার সুযোগ, সেই চাঁদই শত্রুতাবশত তাকে বেনোজলে ডুবিয়ে-চুবিয়ে মারে! ছোটবেলায় মা-খালারা সোনামণিদের গান শোনাতেন ‘আয় আয় চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা’; রাফাতের জন্যও নিশ্চয়ই তার মা দূরসম্পর্কের ভাইয়ের কাছে টিপ দিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। মামা সেই আহ্বানে কর্ণপাত না করে রাফাতকে কঠিন চড় মেরেছিলেন! চড় খেয়ে রাফাত কান্না জুড়লে অভিভাবকরা ভেবেছিলেন হয়তো ক্ষুধার্তের আর্তনাদ! মুখে বোল না থাকলে এমন বিটকেলে পরিস্থিতি হজম না করে উপায় কী!

তারপর কালের প্রবাহে মুখে যখন বোল ফুটল, মনে এলো বসন্ত-ফাল্গুনের আবাহন প্রথম প্রেমপত্র লিখল সে। কন্যা ওপাড়ার জরিনা, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। রাফাতের ‘ওগো চাঁদবদনী কন্যা’ সম্বোধনে হিতে বিপরীত হলো। জরিনা ধরে নিল চাঁদের কলঙ্ক যেমন তার আশপাশের খানাখন্দগুলো, রাফাত তাকে সে বিবেচনায় খোঁটা দিয়েছে। মুখে ব্রণ-মেছতা উঠতেই পারে, কার না ওঠে! তাই বলে সেগুলোকে চাঁদের মতো খান্দখন্দ ও কলঙ্কের ছোপ ছোপ দাগ ভেবে কটাক্ষ করবে রাফাত!

রাগে-ক্ষোভে জরিনা সেই চিঠি তুলে দিল রাফাতের বাবার হাতে। প্রতিক্রিয়া হিসেবে উত্তমমধ্যম জুটল কপালে ও পিঠে! সেবার চোখে সর্ষেফুল ও সূর্য দেখল সে একত্রেই। স্কুলজীবনেও চাঁদ কম ভোগায়নি। কী এক চাঁদের কবিতা আছে, শ্রেণিকক্ষে রাগী শিক্ষকের মুখোমুখি হয়ে প্রায়ই গুবলেট পাকিয়ে ফেলত। তার আবৃত্তি (!) করা ‘চাঁদবাগানের মাথার উপর বাঁশ উঠেছে ওই’ কবিতা-পঙ্ক্তিতে কপালে জুটত বাঁশের কঞ্চির সপাং সপাং বাড়ি। তবুও বাঁশ ও চাঁদকে আলাদা করতে পারেনি। চাঁদ ওঠা এবং ডোবা, বাঁশের আঘাতজনিত বিড়ম্বনার ফাঁকতালে কেটেছে তার কৈশোর। এক ঈদে বাবার বেতন না হওয়ায় রাফাতকে সময়মতো নতুন কাপড় কিনে দেননি। বলেছেন, আগামীকাল দেবেন।

সেবার রাত ১২টায় ঘোষণা এলো আগামীকাল ঈদুল ফিতর! কিশোর রাফাতের কান্না দেখে কে! বাবা এভাবে মিথ্যা বলে ফাঁকি দিলেন! মা যতই বোঝাতে চাইলেন, চাঁদের বুড়ি সুতা দিয়ে পেঁচিয়ে চাঁদটাকে আড়াল করে রেখেছিল বলে কেউই যথাসময়ে চাঁদ দেখতে পায়নি। তারপর বুড়ি যখন সেই সুতা খুলে নাতির জন্য কাঁথা-কম্বল সেলাই করতে শুরু করল, ‘পরিষ্কার’ হলো চাঁদ, সবাই দেখল আগমন ধ্বনি! সেই ঈদে রাত ১টায় তারা ভাত খেতে বসল। ‘সাহরি’র খাওয়া শেষে বাবা রাফাতকে নিয়ে গেলেন দোকানে, কম দামি জামার খোঁজে। সেবার নতুন জামা পরে স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনই শিক্ষক প্রশ্ন করলেন ‘চাঁদ পৃথিবী থেকে কত বড়?’ রাফাত তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিল, ‘চাঁদ বড় হতে যাবে কেন! ওটার সাইজ গরিব মানুষের আটার রুটির মতো!’

জরিনা সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর তো দিয়েছেই; শিক্ষকসহ সবাইকে শুনিয়ে দিয়েছে বহুল প্রচলিত একটি কৌতুক! রিকশাওয়ালা বেশি ভাড়া চাওয়ায় যাত্রী বলেছে, ‘ওই মিয়া, এত ভাড়া চাও কেন? ওই তো গন্তব্যস্থল দেখা যায়!’ তখন রিকশাওয়ালা উল্টো বলল, ‘এখান থেকে চাঁদও তো দেখা যায়! ১০ টাকা দিয়ে চলে যান চাঁদের ছাদে!’ এ কৌতুকে হেসেছে রাফাতও। চাঁদ তাকে ভুগিয়েছে অনেক, আনন্দ দিয়েছে কম। এক জোছনা রাতে তাকে যখন সাপে কাটল পাড়া-প্রতিবেশীরা হতবাক! মানুষ ছাদে গিয়ে, উঠানে মাদুর বিছিয়ে বসে উপভোগ করে জোছনা, সেই চাঁদনী রাতেও কেউ সাপের কামড় খায়! রাফাত কাউকে বোঝাতে পারে না এসবে যে তার হাত কিংবা পা নেই! শৈশবের চাঁদজনিত ‘বিভীষিকা’ ফিরেছে এবারকার ঈদেও। রাত ৮টার পর স্থানীয় মসজিদ থেকে সিদ্ধান্ত জানানো হলো, সবাই যেন তারাবিহর নামাজ পড়তে আসে। সৌদি আরবে যাই হোক, বাংলাদেশে আগামীকাল ঈদ হচ্ছে না। রাত ১২টার আগে এলো নতুন ঘোষণা আগামীকাল ঈদ, টুঁটে দাও নিদ! সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাফাত বুঝতে পারল, শৈশবে তার পড়া ‘চাঁদবাগানের মাথার উপর বাঁশ উঠেছে ওই’ কবিতা-পঙ্ক্তি খুব একটা ভুল ছিল না!

ঈদের রেশ কাটতে না কাটতেই এলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিনব দাবি চাঁদ মঙ্গলের অংশ! অথচ এদ্দিন রাফাত ভেবে এসেছে, বাংলাদেশে চাঁদকে নিয়ে যেভাবে আদিখ্যেতা করা হয়, চাঁদ বাংলাদেশেরই নিজস্ব সম্পদ! ‘ইতিহাস বিকৃতি’ হলেও আমোদিত হলো রাফাত ট্রাম্প লোকটা সত্যিই কিউট। যে টুইটারে তিনি পোস্ট করেন সেটাকে কত সহজেই ‘টাইপ রাইটার’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেন! ট্রাম্প চাঁদের কলঙ্ক দূর করতে না পারুন, বিজ্ঞানকে নিশ্চয়ই এগিয়ে নেবেন অনেক দূর।