নকলনবিস

ঢাকা, শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০১৯ | ৬ বৈশাখ ১৪২৬

নকলনবিস

হাফিজ উদ্দীন আহমদ ২:৩১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৯, ২০১৯

print
নকলনবিস

তখনো ফটোকপি মেশিন দেশে আসেনি। সব অফিসে বাংলা টাইপ রাইটারও নেই। এ অফিসও ব্যতিক্রম নয়। ব্রিটিশ আমলের রেমিংটন ইংরেজি টাইপ রাইটার আছে একটা। কিন্তু সরকারের কড়া নির্দেশ, অফিসের কাজকর্ম বাংলা ভাষায় করতে হবে। তাই বাংলায় হাতে লিখে নথি সংরক্ষণ ও পত্র চালাচালি করতে হয়। ফটোকপি কী তা জানা ছিল না। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কপি করার জন্য বহু সরকারি অফিসে নকলনবিস রাখা হতো। মফস্বলের এ এসডিও অফিসেও নকলনবিস রাখা হবে। বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো।

নির্দিষ্ট দিনে ইন্টারভিউ শুরু হলো। কয়েকজন গণ্যমান্যকে নিয়ে এসডিও কামরান সাহেব বোর্ডে বসলেন। পিএ নাজির আলী গোটা দশেক জীবনবৃত্তান্তসহ দরখাস্ত টেবিলে এনে রাখল।
: মাত্র দশটা! আর নেই?
কামরান সাহেব ভ্রূ কুঁচকালেন। যদিও একজন লোক নেবেন, কিন্তু আবেদনকারী বেশি না হলে ইন্টারভিউ জমে না।
: আছে, স্যার। আমরা টু গ্র্যাজুয়েট চেয়েছি। এগুলো সব বিএ পাস। একটা লোকের ডিগ্রি বেশি।
: সেটা দাওনি কেন?
: ওকে চিনি, আমাদের পাশের গ্রামের ছেলে। ও পরীক্ষায় নকল করে ধরা পড়েছিল। ইনভিজিলেটর তার খাতা কেড়ে নিয়েছিলেন কিন্তু তার পায়ে পড়ে মাফ চেয়ে খাতা ফেরত পেয়েছিল। পনেরো মিনিটের মধ্যে আবার নকল করায় তাকে হল থেকে বের করে দিতে গেলে ভিরমি খেয়ে পড়ে যাওয়ায় গার্ড শেষ পর্যন্ত চরম ব্যবস্থা নেননি। ও নকল করে এমএ পাস করেছে। কলম ঘোরানো দেখেই বুঝতে পারে সামনের ছাত্র কী লিখছে!
: এ রকম লোকই চাই। আমি তো নেব নকলনবিস অর্থাৎ নকলে এক্সপার্ট। ওকে ভেতরে পাঠাবে!
: জি, স্যার।
ইন্টারভিউ শুরু হয়েছে। কামরান সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন প্রথম প্রার্থীকে
: নকল করেছেন ফাইনাল পরীক্ষায়?
: কী যে বলেন স্যার! জীবনেও নকল করিনি। সব পরীক্ষায় নিজের মেধায় পাস করেছি।
একে একে দশজনকে নাম-ধাম জিজ্ঞাসা করার পর একই প্রশ্ন করলেন তিনি। উত্তরে সবাই প্রায় একই কথা বলল। অবশেষে এলো সেই একাদশ ব্যক্তি। প্রশ্ন করলেন কামরান সাহেব
: নাম কী?
: শহীদ হোসেন।
: আপনি এমএ পাস?
: জি, স্যার।
: মাস্টার্স পরীক্ষায় কি নকল করেছেন?
এ ধরনের প্রশ্নে শহীদ থতমত খেয়ে চুপ করে রইল।
: বলুন, বলুন!
অধীর হয়ে উঠলেন এসডিও কামরান। নিজের মুখে নকলের যোগ্যতা স্বীকার না করলে কী করে নির্বাচিত করবেন?
পিএ নাজির আলী বলল, আপনি নকল করতে গিয়ে ধরা খেয়েছিলেন। বলেন না কেন? স্যার তো নেবেন নকলনবিস, যে নকল করতে পারে!
ভরসা পেয়ে মিনমিন করে সে জি, স্যার। নকল করেছিলাম!
: বেশ! আমি এ রকম লোকই চাই।
এসডিও সাহেবের কথা শুনে বুকের বল বাড়ে। নিজেকে খুলে ধরে সে এইচএসসি থেকে সব পরীক্ষাতেই কমবেশি নকল করেছি। হস্তাক্ষরের স্টাইলও অনুকরণ করতে পারি।
: ভেরি গুড! আপনাকে অ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দিচ্ছি।
সেদিনই চাকরি হয়ে গেল তার।
শুধু দলিল বা নথি নকল নয়, কামরান কোনো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি কপি করার জন্য ডাকলে তার কলম ঘুরিয়ে লেখার সময়ই সে বুঝে ফেলে কী লিখছেন! লেখা শেষ হওয়া মাত্রই তার প্রতিলিপি একই সঙ্গে তৈরি হয়ে যায়। এসডিও কামরান মহাখুশি। কিন্তু তিন-চার মাস পরই অভিযোগ এলো, কামরান সাহেবের দস্তখত নকল করে গুচ্ছগ্রামের একটি ঘর নিজের নামে করে নিয়েছে সে। মহাখাপ্পা হয়ে কামরান তক্ষুনি চিঠি দিলেন তাকে বরখাস্তের।
কিছুদিন পর এক ভদ্রলোক এসডিওর রুমে ঢুকে পড়লেন। কামরান অবাক হলেন। তার কক্ষে এভাবে কেউ প্রবেশ করে না। বললেন, আমি এখানকার নতুন এসডিও হয়ে আসব। আপাতত জায়গাটা দেখতে এসেছি। কয়েকদিন পর ফ্যামিলি নিয়ে আসব। দু-চার দিন পরই অর্ডার বের হবে। চিন্তা করবেন না এক্সেপ্ট হয়ে যাবে আপনার রেজিগনেশন।
: রেজিগনেশন?
আকাশ থেকে পড়লেন কামরান।
: ওরাও সবাই অবাক হয়েছে। তাই অনেক বলে-কয়ে দেখাতে নিয়ে এসেছি আপনার দেওয়া মূল পত্রটা।
কামরান চোখ বোলালেন। মন্ত্রণালয়কে উদ্দেশ্য করে লেখা আমাকে অবিলম্বে বর্তমান চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক। নিচে তারই স্বাক্ষর ও সিলমোহর। হাতের লেখাটাও নিজের মনে হচ্ছে।
ধা করে মনে পড়ল, শহীদকে তিনি নিজ হাতে লিখেছিলেন তোমাকে অবিলম্বে বর্তমান চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো। সব কথা ঠিক রেখে তারই মতো হস্তাক্ষরে ‘তোমাকে’কে আমাকে এবং ‘হলো’কে হোক করেছে শহীদ। ঘটনার পর থেকে সে লাপাত্তা। মাথাটা ঘুরছে। এখনই ঢাকায় যেতে হবে চাকরি ঠিক রাখতে। যেতে যেতে পিএকে উদ্দেশ করে বললেন দেখলে নাজিব, আমার সিলেকশন কত নিখুঁত। এমনভাবে আমার লেখা নকল করেছে যে আমি নিজেও তা অন্যের বলে মনে করতে পারছি না। একেই বলে নকলনবিস!