বীমার ফাঁদে

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ | ৫ চৈত্র ১৪২৫

বীমার ফাঁদে

শফিক হাসান ১২:৫২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৮, ২০১৯

print
বীমার ফাঁদে

নতুন বছর মানেই অনিবার্যভাবে নতুন কোনো বগিজগির মুখোমুখি হওয়া। চলতি বছরের এক সপ্তাহ কেটে গেলেও কোনো বগিজগির দেখা পেল না মাকসুদ। অষ্টম দিনের একটি ফোনকল দুর্ভাবনা থেকে মুক্তি দিল তাকে! মতিন ভাই নিজের প্রয়োজন ছাড়া কল করেন না। প্রথমবারের মতো হিতাকাঙ্ক্ষীর ভূমিকা নিলেন। ফোনালাপে মধুর কণ্ঠে জানালেন, দীনহীনভাবে আর কত দিন! নববর্ষের প্রারম্ভেই নবজীবনের সূচনা করতে হবে।

পরদিন মতিন ভাই নিয়ে গেলেন এক বীমা কর্মকর্তার কাছে। তার অফিসের পিয়ন ভুলে চাবি নিয়ে চলে গেছে গ্রামের বাড়িতে। তাই একটা ছাপড়া হোটেলে বসতে হলো। দামি পোশাকপরা কর্মকর্তা হ্যান্ডশেক করার পরই প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘ভাবী কিছু করেন?’ না-বোধক উত্তর শুনে চুকচুক শব্দ করে আবার বলেন, ‘বাচ্চা কোন ক্লাসে পড়ে?’
‘কথা শেখার পরে পড়বে!’
‘বাচ্চাকে কী বানাবেন?’

‘আগে বড় হোক, তারপর দেখবো।’
‘ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যাই বানান-প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই!’
ক্যারিয়ারবিষয়ক ম্যারাথন বক্তৃতায় ধন্দে পড়ে গেল মাকসুদ। কুঁড়ি কবে ফুল হবে-কাঁটার যন্ত্রণা পরীক্ষা করতে হবে আগেই! নিজের অক্ষমতার কথা শোনার জন্যই কি এখানে আসা! তাকে অকূল থেকে টেনে তোলেন মতিন ভাই। বীমা কর্মকর্তা আকমল হোসেনকে বললেন, ‘বলেছিলাম না, ও একটা বোদাই! মানুষ করানোর জন্যই তো আপনার কাছে এনেছি।’

‘আসল জায়গায় যখন এনেছেন, চিন্তা নেই। আমি হচ্ছি ক্রেন, দুর্ভাগাদের টেনে তোলাই কাজ!’
চা-শিঙ্গাড়ার অর্ডার দেওয়া হয়েছে মিনিট পনেরো আগে। বয়দের মধ্যে কোনো গরজ লক্ষ করা গেল না। ফুটন্ত তেলের শব্দ জিভে জল এনে দেয়। কিছুক্ষণ পর ফের হাঁক দিলেন বীমা কর্মকর্তা। এবার কাজ হলো। শিঙ্গাড়ায় কামড় দিয়ে আকমল হোসেন তাকালেন মাকসুদের দিকে-‘বুঝলেন, জীবনটা হবে শিঙ্গাড়ার মতো চনমনে, নেতানো অবস্থার ঠাঁই নেই!’

‘মামা-খালু এবং নগদ টাকা নেই, এটা আমার ব্যর্থতা হতে পারে, দোষ নয়। চেষ্টা কম করিনি।’
‘আমাদের কোম্পানি আপনাকে দেবে স্বাচ্ছন্দ্য। যাতায়াত লোকাল বাসেই করেন?’
‘হ্যাঁ। মাঝেমধ্যে রিকশায়ও।’
‘অন্তত ছয় মাস আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। আপনার নিজেরই গাড়ি হবে, পরে ফ্ল্যাট। ভাড়া বাসায় কত দিন থাকবেন!’
‘কীভাবে সম্ভব!’

‘এটা তো শুরু! এলাকায় মানসম্মান বাড়বে। আত্মীয়স্বজন আপনাকে ছাড়া কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানও করবে না! এখন ক্লায়েন্ট জোগাড় করেন।’
‘তাদের কোথায় পাব?’
‘মহল্লায় পাবেন, আপনার গ্রামেও পাবেন। রাস্তাঘাটেও অনেক মানুষ। তাদের দিয়েই শুরু করেন।’
কাজের পদ্ধতি সম্বন্ধে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝালেন আকমল হোসেন। সবকিছুতেই মতিন ভাই সাপোর্ট দিলেন-‘একদম সহজ। মিনারেল না, জেনারেল পানির মতো।’
ক্যানভাসার ও হকাররা তার স্বরে চেঁচিয়ে পণ্য বিক্রি করে, মাকসুদের পক্ষে এ কাজ সম্ভব হবে কীভাবে! দুর্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয় কম বেতনে চাকরির গ্লানি।

অদৃশ্য গাড়ির চাবি ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখাতে দেখাতে মুখে খই ফোটে সীমাহীন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখানো বীমা কর্মকর্তার। হোটেল থেকে বেরিয়ে মতিন ভাই বোঝান, ‘সুযোগ হারাবি না। বড় ভাইয়ের কথামতো কাজ কর!’
ক্যাশ কাউন্টার থেকে ভেসে আসে বাদানুবাদ। ম্যানেজার বলছেন, ‘বাকি অইবো না। আগের বারো শ’ সতেরো টাকা অনেক দিন ধইরা ঘুরাইতাছেন! টাকা দিতে না পারলে গলার টাই খুইলা দিয়া যান!’

পরিস্থিতি বুঝে কাছে থাকা সমীচীন মনে করল না উভয়েই। মতিন ভাই পান দোকানে সিগারেট কেনার উছিলায় পা বাড়ান। ওদিকটা চুকিয়ে কিছুক্ষণ পর অদৃশ্য ফ্ল্যাট ও গাড়ির চাবি বুঝিয়ে দিলেন আকমল হোসেন। বিদায় পর্বেও সামাজিকভাবে মর্যাদাবান থাকতে অর্থকড়ির মূল্য কী জানাতে ভুললেন না। মতিন ভাইকে নিয়ে তিনি নিরাপদ দূরত্বে গেলে মাকসুদ হোটেলের সমুদয় বকেয়া মিটিয়ে দেয়। ম্যানেজার অবাক হয়ে বলেন, ‘ওই টাউটের বিল আপনে দিতাছেন ক্যান!’

‘উনি আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু।’
তিন দিন পরে বীমা কর্মকর্তা কল করেন; কণ্ঠে উষ্মা-‘হোটেলের বিল দিয়ে আমাকে অপমান করলেন! কোম্পানি থেকে ৩৯ মিনিটের নাটক বানাচ্ছি। সেটার রিহার্সেলই দিলাম ওই দিন!’

‘ভালো উদ্যোগ। তবে আমি রিহার্সেল দিইনি। আমার ছোট চাকরি কারও কাছে ঋণী থাকার শিক্ষা দেয় না!’
‘হবে, আপনার হবে। এ বছরেই শীর্ষাসনে উঠবেন। কজন ক্লায়েন্ট জোগাড় করেছেন!’