নালিতাবাড়ীর ‘সেন্টু শাইলে’ আলোড়ন

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০ | ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

নালিতাবাড়ীর ‘সেন্টু শাইলে’ আলোড়ন

এম. সুরুজ্জামান, নালিতাবাড়ী ৯:১৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৮, ২০২০

print
নালিতাবাড়ীর ‘সেন্টু শাইলে’ আলোড়ন

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত কৃষক সেন্টুচন্দ্র হাজং (৪৫)। দেশি ধানের জাত আবিষ্কার করে তিনি সফলতা পেয়েছেন। ব্রিডিং ও শঙ্করায়ন পদ্ধতিতে নিজ হাতেই আবিষ্কার করছেন নতুন জাতের দেশি ধান। তার বীজ ধান নিয়ে আশপাশের কৃষকও লাভবান হচ্ছেন। তার আবিষ্কৃত সেন্টু শাইল চিকন জাতের ধানে ফলন ভালো হওয়ায় ইতিমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

মাটির গুণাগুণ ধরে রাখতে জৈব পদ্ধতিতে তিনি ছয় একর জমিতে দেশি জাতের ধান আবাদ করেছেন। বিলুপ্ত হয়ে গেছে বা বিলুপ্ত হতে চলেছে- এমন বগি, হালই, গোলাপি, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল, খাসিয়াবিন্নিসহ বেশ কয়েক ধরনের আমন জাতের ধান ৪০০ প্লটে চাষ করেন তিনি। বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের এক একর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান ট্রায়াল করে লাগিয়ে রেখেছেন। নিজের ছয় একর জমিতে গোবর সার ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার দিয়ে সেন্টু শাইল, চিনিশাইল, তুলসীমালা, পাইজাম, ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নি ধান লাগিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানও বেশ ভালো হয়েছে।

সেন্টু হাজং খোলা কাগজকে জানান, বেসরকারি সংস্থা কারিতাস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শঙ্করায়ন ও ব্রিডিং পদ্ধতিতে নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করেন। নিজের এক একর জমিতে ট্রায়ালও করেছেন। এখানে নাম ও নামবিহীন আমন জাতের ১০০টি জাত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ব্রিডিং ও শঙ্করায়নের মাধ্যমে নতুন জাতের ধান আবিষ্কারের জন্য ২০ রকমের দেশি ধান লাগিয়েছেন। এ বছর তার আবিষ্কার করা নতুন জাতের ধানের নাম রাখবেন বলে জানান। তার আবাদকৃত ধানের জমিতে তেমন বালাইনাশক ব্যবহার করেন না।

তিনি আরও জানান, দেশি জাতের ধানে এমনিতেই পোকার আক্রমণ কম হয়।

অন্যদিকে কেঁচো কম্পোস্ট ও গোবর সার ব্যবহার করাতে ধানের গাছ শক্ত ও মজবুত হয়। ঝড় বৃষ্টি কিংবা উঁচু হলেও হেলে পড়ে না। সামান্য পোকার আক্রমণ হলে নিমপাতা, গোলঞ্চপাতা ও বাসকপাতা পানিতে ভিজিয়ে ফুটিয়ে তারপর মেশিনের সাহায্যে জমিতে স্প্রে করেন। পাশাপাশি জৈবপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ধানের উৎপাদন খরচও কম পড়ে। এসব দেশি জাতের ধান মোটামুটি ভালো হলে একরে ৪০ থেকে ৫০ মণ হারে উৎপাদন হয়।

একই গ্রামের কৃষক বিল্লাল হোসেন ও আন্ধারুপাড়া গ্রামের কৃষক হাবিল উদ্দিন সেন্টুর কাছ থেকে শঙ্করায়ণ করা সেন্টু শাইল জাতের ধান আবাদ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন। ওই গ্রামের অপর রত্নেশর বর্মণ জানান, সেন্টু শাইল জাতের চিকন ধান দুই একর জমিতে লাগিয়েছেন। এ জাতের ধানের বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়। তা ছাড়া শুকনা ধান ৫০ মণ হারে ফলন হয়। বাজারে চাহিদাও বেশ।

এক প্রশ্নের জবাবে সেন্টু বলেন, রাসায়নিক সার ব্যবহার করার ফলে দিন দিন জমির উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলছে কৃষক। তিনি জানান, ধান নিয়েই তার সব গবেষণা। ১৯৯১ সালে পরীক্ষা দিয়েও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। প্রায় ৩০ বছর যাবৎ কৃষি কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। আর প্রায় আট বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার গবেষণার কাজে সহায়তা করেন স্ত্রী অবলা রাণী হাজং।

এ ব্যাপারে নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবির বলেন, সেন্টু চন্দ্র হাজং প্রতি বছরই দেশি জাতের ধান ট্রায়াল করে আবাদ করেন। তার আবিষ্কৃত দেশি জাতের ধান সেন্টু শাইলের ফলন ভালো হওয়ায় বাজারে বেশ চাহিদা রয়েছে। দেশি জাতের ধান সংরক্ষণে তার উদ্যোগটি খুবই ভালো। কৃষিবিভাগ থেকে সেন্টু শাইল ধানের উদ্ভাবক সেন্টু চন্দ্র হাজংকে জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে।