সোমবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৮
প্রাইভেট কারেই যানজট
খোলা কাগজ প্রতিবেদক
Published : Wednesday, 10 January, 2018 at 11:32 AM, Update: 10.01.2018 11:57:00 AM
প্রাইভেট কারেই যানজট
ব্যক্তিগত পরিবহন বাড়ায় অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছেছে রাজধানীর যানজট। কার ও জিপের মতো ছোট পরিবহনগুলোর দখলে চলে গেছে রাজধানীর ৭৬ ভাগ সড়ক। এসব পরিবহনে চলাচল করে মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ। যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণেও দখল হয়ে থাকছে সড়কের বিশাল অংশ। অন্যদিকে ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষের জন্য চলছে স্বল্পসংখ্যক গণপরিবহন। যার সংখ্যাও কমছে ক্রমাগত। ফলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে দিন দিন। যানজটে পড়ে নষ্ট হচ্ছে বিপুল কর্মঘণ্টাও।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন প্রকৌশলীরা বলছেন, ব্যক্তিগত পরিবহনে নিয়ন্ত্রণ না থাকা, সড়কের অব্যবস্থাপনা এবং পর্যাপ্ত রুট না থাকায় রাজধানীতে এ পরিস্থিতি চলছে। যানজটের কারণে কর্মঘণ্টা যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনি কমে যাচ্ছে কর্মস্পৃহাও। কেন না রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষের জীবনের বিশাল একটা সময় নষ্ট হচ্ছে শুধু যানজটের কারণেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে শিগগিরই এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারলে রাজধানীর যানজটের অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে। বাসযোগ্যতা হারাবে এ নগর।
নগর গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম মনে করেন, বিআরটিএর তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে ৩০ হাজার বাস থাকলে রাজধানীবাসীকে কোনো দুর্ভোগই পোহাতে হতো না।
বিআরটিএর হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত ১০ মাসে সারা দেশে ব্যক্তিগত গাড়ি বেড়েছে ৬ গুণেরও বেশি। গত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২৩ হাজার ৫৪৬টি ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার ও জিপ নিবন্ধিত হয়েছে। অন্যদিকে গণপরিবহন (বাস ও মিনিবাস) নিবন্ধিত হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭টি। দেশে গড়ে প্রতিদিন ৬৫টি ব্যক্তিগত গাড়ি ও ১২টি গণপরিবহন নিবন্ধিত হয়েছে।
বিআরটিএর গত বছরের সেপ্টেম্বরের এক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে বর্তমানে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকারের সংখ্যা দুই লাখ ৫৫ হাজার ৬২২টি, যা ২০১০ সালে ছিল এক লাখ ৬৩ হাজার চারটি। এখানে ব্যক্তিগত মাইক্রোবাস চলছে ৭০ হাজারের ওপরে।
নিবন্ধিত অন্য যানবাহনের সংখ্যাও বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১১ লাখ ৫০ হাজার ৭০৮টি, যা ২০১০ সাল পর্যন্ত ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। আট বছরে বাসের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ২৭৪টি, ২০১০ সালে বাস ছিল ১৬ হাজার ৭৮৩টি। আট বছর আগে মিনিবাস ছিল ৯ হাজার ৪৯০টি, বর্তমানে সে সংখ্যা ১০ হাজার ৩২৬। এ ছাড়া বর্তমানে সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে ৯ হাজার ৫৫টি, যা ২০১০ সালে ছিল ৭ হাজার ৬৬৪টি। আর ৪৬ হাজার ২০২টি মাইক্রোবাস থেকে এখন হয়েছে ৭১ হাজার ৭০০টি মাইক্রোবাস।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় দুই কোটি মানুষের এ ঢাকায় যে পরিমাণ সড়ক থাকার কথা তা নেই। এখানকার সড়কে সর্বোচ্চ তিন লাখের মতো পরিবহন চলাচল করতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও চার গুণ বেশি পরিবহন চলছে এ শহরে। এখন যেখানে তিন লাখের ওপরে শুধু ব্যক্তিগত গাড়িই চলাচল করে সেখানে গণপরিবহন চলাচলের জায়গা কোথায়?
সিটি করপোরেশনের বরাত দিয়ে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংগঠন জানিয়েছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবে, রাজধানীতে সড়ক রয়েছে দুই হাজার ৫০৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক ৮৮ কিলোমিটার। যার ৮০ ভাগই ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে থাকে। ঢাকার ১৬৮টি রুটে বর্তমানে গণপরিবহনের সংখ্যা মাত্র ৫ হাজার ৪০৭টি। যার অধিকাংশই লক্কড়-ঝক্কড়, যাত্রী পরিবহনে অযোগ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত কয়েকটি কারণে প্রতি বছর ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ছে। গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকা, ব্যক্তিগত গাড়ির রাস্তায় অবৈধ ও অবাধ পার্কিং সুবিধা, সহজে নিবন্ধন ও সিএনজি জ্বালানির সুবিধা পাওয়ার কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়া মানুষের বৈধ-অবৈধ আয় বৃদ্ধির কারণেও ব্যক্তিগত গাড়ি কেনায় আগ্রহ বাড়ছে।
ব্যক্তিগত গাড়িতে অনুৎসাহ তৈরি এবং এর ব্যবস্থাপনার জন্য এর আগে সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে ১০০ থেকে ৫০০ শতাংশ হারে করারোপ করা এবং জোড়-বেজোড় সংখ্যার গাড়ি চলাচলের জন্য দিন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব উদ্যোগ ভেস্তে গেছে নানা কারণে। বিশেষজ্ঞরা স্বল্পমূল্যে জ্বালানি পাওয়াকেই দুষছেন এ জন্য। পাশাপাশি তারা রাজধানীতে গণপরিবহন বাড়িয়ে এ সংকট থেকে উত্তরণের উপায়ও বাতলে দিচ্ছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় নিবন্ধিত বাসের যে সংখ্যা দেখানো হয়েছে তার তিন ভাগের একভাগও রাস্তায় নেই। অথচ দুই কোটি লোকের বাস এই শহরে। এ ছাড়াও বাসের সংখ্যা যাই হোক, পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের অভাবেই মূলত যানজট কমছে না। শুধুই ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য যানজট হচ্ছে, এটা ভুল ধারণা। তিনি বলেন, মানুষ সড়কে নেমে গণপরিবহন পাচ্ছে না, ট্যাক্সি পাচ্ছে না, কিছু সিএনজি রয়েছে কিন্তু সেগুলো মানুষের চাহিদামতো চলাচল করে না। ফলে সমস্যা দিন দিন বাড়ছেই। একটা শহরে উন্নত কার্যকর গণপরিবহন না থাকলে এক সময় ওই শহর মুখ থুবড়ে পড়বে। ঢাকার মতো একটা শহরে কমিউটার ট্রেন, মেট্রোরেল, র‌্যাপিড বাস, ট্যাক্সি থাকা অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু এখানে এসবের কোনো কিছুই নেই। এসব নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনাও নেই, আর যা আছে তার সঠিক বাস্তবায়ন নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান বলেন, ‘এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার ৮০ ভাগ সড়ক দখল করে রাখে ব্যক্তিগত গাড়ি। আর গণপরিবহন দখল করে মাত্র ৭ শতাংশ রাস্তা। বাকি অংশ দখল করে আছে অন্য গাড়ি, অবৈধ দখল ও অবৈধ পার্কিং। তিনি বলেন, সারা দেশে যেসব গণপরিবহন আছে সেগুলোর অধিকাংশই পুরনো ও ভাঙা, যাত্রী পরিবহনে অযোগ্য। এর বাইরে যত্রতত্র স্থানে গাড়ি থামানো ও যাত্রী ওঠানামার কারণে মানুষ নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে পারে না। গণপরিবহনের এসব অব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন বেড়েই চলেছে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও।
ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দখল করে রাখে বলে জানিয়েছেন, বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় প্রতি ১০ বর্গফুট জায়গাতে মাত্র দুজন মানুষ চড়তে পারেন। অন্যদিকে, গণপরিবহনে একই পরিমাণ জায়গায় বসে ও দাঁড়িয়ে ১৫-১৬ জন যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সেই হিসাবে যতসংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি, তা ঢাকার রাস্তার অর্ধেকের বেশি দখল করে রাখে। বাকি অংশ থাকে অবৈধ দখলে। কিছু অংশে চলাচল করে গণপরিবহন। 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();