বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭
ধর্ষণের মহামারি, সমাধান কী
ইসহাক খান
Published : Wednesday, 13 September, 2017 at 11:40 AM
ধর্ষণের মহামারি, সমাধান কী
রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপা পড়ে যাচ্ছে ধর্ষণের খবর। তার মানে কি রোহিঙ্গা মুসলমানদের বার্মিজ আর্মি কর্তৃক অত্যাচারের পর বাঙালির ইসলামি জোশ বেড়ে তারা ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট কাজ থেকে বিরত রয়েছে। ঘটনা এমন হলে খুব আনন্দিত হওয়া যেতো। কিন্তু না। মিডিয়া হটকেক হিসেবে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ব্যস্ত হলেও ধর্ষণ ঘটনা কিন্তু থেমে থাকেনি। নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে তিন শিশুকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে বাদল নামের এক পিশাচ। পরে তিনজনের পক্ষে এক শিশুর মা বাদী হয়ে বন্দর থানায় মামলা করেন। রোববার সকালে বন্দর চৌরাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার সূত্রপাত, তিন পরিবারের সবাই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে প্রতিবেশী লম্পট বাদল গত ৮ অগাস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে তিন শিশুকে বিভিন্ন ধরনের প্রলোভন ও তার মোবাইল ফোনের ভিডিও দেখিয়ে ধর্ষণ করে।
টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে সখীপুরে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে তারই খালু। ওই ছাত্রী জানিয়েছে, মাস দুয়েক আগে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নির্জন বনের ভেতর নিয়ে তার খালু তাকে ধর্ষণ করে। গত ৭ জুলাই বাড়িতে একা পেয়ে ঘরের ভেতর ঢুকে দ্বিতীয় দফায় তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের কথা প্রকাশ করলে তাকে হত্যার হুমকি দেয় ছাত্রীর খালু। পরে মেয়েটি মা-বাবার কাছে ঘটনাটি খুলে বলে। তারপরই ছাত্রীর বাবা মা আইনের আশ্রয় নেয়। পুলিশ জানিয়েছে ওই ধর্ষককে গ্রেপ্তারের জোর চেষ্টা চলছে।
ঈদের একদিন আগে শুক্রবার বাড়ির পাশে পুকুরে সিনথিয়ার লাশ পাওয়া যায়। যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবারের ধারণা। সিনথিয়া আকতার (৮) গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের বাউসি গ্রামের সেলিম মিয়ার মেয়ে এবং ফুলছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। এ ঘটনায় সিনথিয়ার বাবা বাদী হয়ে ঈদের দিন ফুলছড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাউসি গ্রামের সাইফুল ইসলামের ছেলে আহসান হাবীব সিজার (২২) ও ছায়দার হোসেনের ছেলে মাজেদুল ইসলাম কাল্টু মিয়াকে (২৮) আটক করেছে।
সিনথিয়ার দাদা গেলেন্দা শেখ আফসোস করে বলেন, ‘সিনথিয়ার জন্য ঈদের জামা কাপড় কেনা হলেও তা পরার ভাগ্য তার হলো না।’ সিনথিয়ার বাবা সেলিম শেখ জানিয়েছেন, ‘আমাদের ধারণা ওকে একা পেয়ে প্রতিবেশী সিজার সহযোগীদের নিয়ে ধর্ষণ করে। বিষয়টি পরিবারের লোকজন জানাতে পারে ভেবে তাকে হত্যার পর লাশ পুকুরের কচুরিপানার নিচে চাপা দিয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই দুই যুবক পুলিশ এবং এলাকাবাসীর সামনে ধর্ষণ এবং হত্যার কথা স্বীকার করলেও ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে। পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছে স্থানীয় কিছু মাতব্বর ও প্রভাবশালী ব্যক্তি।
ঈদের দিন সকালে ২২ বছরের এত তরুণীকে গণধর্ষণ করেছে চার ধর্ষক। বাউফলের আদাবাড়িয়া ইউনিয়নে মিলঘর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ ওই তরুণীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। আক্রান্ত তরুণী জানিয়েছেন, তার মা পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। ঘটনার দিন সকাল ৭টার দিকে তিনি হাসপাতাল থেকে দশমিনা উপজেলার গোলখালি গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন। তিনি লোহালিয়া খেয়া পার হয়ে একটি ভাড়ায় মোটরসাইকেলে ওঠেন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মটরসাইকেলটি মিলঘর এলাকায় পৌঁছলে ৪ যুবক মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। ড্রাইভারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তরুণীকে জোরপূর্বক মুখ চেপে কাছেই একটি পরিত্যক্ত ভিটায় নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে তার চিৎকারে স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি এসে উদ্ধার করে। এবং কবির শরীফ নামের এক ধর্ষককে আটক করে। (সূত্র : কালের কণ্ঠ)।
টাঙ্গাইলের মধুপুরে রূপা নামের যে মেয়েটিকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, সেই ব্যাপারটা আমাদের মিডিয়ায় সেভাবে আলোচিত হয়নি। ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইয়েরাও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেন। এমন ধরনের একটি ঘটনা ভারতেরও ঘটেছিল। চলন্ত বাসে একজন মেডিক্যালের ছাত্রীকে ধর্ষণের পর চলন্ত বাস থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছিল। তাতে সারা ভারতে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। কিন্তু আমরা রূপার জন্য কী করলাম? দেশ তোলপাড়ের পরিবর্তে মামলার দু’নম্বর আসামিকে জামিন দিয়ে দেওয়া হলো। এই যদি বিচারের নমুনা হয় তাহলে আশা করা যায় ধর্ষণ বানের পানির মতো ফুলে ফেঁপে উঠবে। বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম, আমাদের মুসলমান ভাইয়েরা তাদের ইমানি জোশে যতটা রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের জন্য ব্যাকুল ততটা নিজ দেশের নারী-শিশুদের জন্য নয়। তারা রোহিঙ্গাদের রক্ষার জন্য বার্মিজ আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে লক্ষ মানুষের মিছিল নিয়ে রাখাইন যাত্রা করতে প্রস্তুত। অথচ নিজ দেশে অমানবিকভাবে নারী ও শিশু নির্বিচারে ধর্ষিত হচ্ছে তাতে কোনো মাথাব্যথা নেই। ধর্ষণের প্রতিবাদে মিছিল তো দূরের কথা, তারা একটি মানববন্ধনও করলেন না। কেন, আমাদের নারী শিশুরা কি মূল্যহীন? তারা কি বানে ভেসে এসেছে? আমাদের নারী-শিশুরা কি মুসলমান নয়? তাহলে কি ধরে নেবো মুসলমান কর্তৃক নারী শিশু ধর্ষিত হলে সেটা জায়েজ? যদি অন্য ধর্মের কেউ মুসলমান নারী এবং শিশুকে ধর্ষণ করে তখন ধর্ম এবং জাত দুই চলে যায়। তখন তারা মাঠে নামতে ইমানি জোশ অনুভব করে। অদ্ভুত আমরা- আমাদের বাঙালিদের মানসিকতা। নিজের পাছায় কাপড় খুলে অন্যের পাছায় খোঁচাতে আমাদের জুড়ি নেই।
হতভাগ্য রূপার ব্যাপারটা সম্ভবত ধামাচাপা পড়ে যাবে। কারণ রূপার পক্ষে শক্ত করে দাঁড়াবার কোনো ব্যক্তি বা মিডিয়া নেই। ফেসবুকে কত কিছু নিয়ে বন্ধুরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। অথচ এমন একটি নৃশংস ঘটনার পরও কাউকে তেমন ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা গেলো না। যারা দু’চারজন এ নিয়ে লেখালেখি করেছেন তারাও অন্যদের সমর্থন না পেয়ে হতাশ হয়ে বিষয়টি বাদ দিয়ে বসে আছেন। কিন্তু আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আমাদের বিচার বিভাগ যদি হাত গুটিয়ে বসে থাকে তাহলে নির্যাতিতরা কোথায় যাবে? কার কাছে তারা বিচার চাইবে?
দিনে দিনে ধর্ষণ মহামারির আকার ধারণ করছে। এখনই যদি এ বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা না যায় ভবিষ্যতে মহাদুর্যোগ দেখা দিতে পারে। স্বাভাবিকভাবে অনেক মানুষ বিকৃত রুচি এবং স্বভাব নিয়ে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। তারা সংযত হয়ে জীবনযাপন করতে পারেন না। সব মানুষই এক রকম হবে তেমনটা আশা করা ভুল। এর জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। কিছুদিন আগে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা খুব বেড়ে গিয়েছিল। এসিড নিক্ষেপের আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করায় এবং দু’একটি ঘটনায় তা কার্যকর করায় বর্তমানে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা অনেক কমেছে। এমনকি ব্যাপারটা আগের মতো শোনা যায় না। এ ক্ষেত্রেও ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হলে দেখা যাবে এ মহামারি অনেক কমে গেছে।
পৃথিবীর সব দেশেই সব কালেই কিছু বিকৃত রুচির মানুষ থাকে। তারা আপন-পর বিচার করার বোধ হারিয়ে ফেলে। তাদের জন্য সব বড় শহরেই পতিতাপল্লি আছে। আমাদের দেশেও ছিল। কিন্তু অসামাজিকতা এবং অধর্মের দোহাই দিয়ে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ সেই পতিতাপল্লি ভেঙ্গে পতিতাদের উচ্ছেদ করে দিলো। ফলে কী হলো, সেই পতিতারা গৃহ ছেড়ে শহরময় চষে বেড়াতে লাগলো। আজ যদি সেই পতিতাপল্লিগুলো থাকতো তাহলে এ বিকৃত রুচির মানুষদের একটা উপায় থাকতো। তারা সেখানে নিজের উত্তেজনা প্রশমিত করার সুযোগ পেতো। রাষ্ট্রকে যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয় ধর্ষকের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে, না হলে বিকৃত রুচির মানুষদের জন্য পতিতাপল্লির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ভাবে গা ঢিলে দিয়ে থাকলে যে ফোঁড়া সামান্য গুটি হয়ে মুখ বের করেছে সময় সুযোগে সেই ফোঁড়া ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। তখন কপাল চাপড়ে কোনো উপায় বের করা যাবে না। অতএব যে কোনো একটি পথ বেছে নেওয়া রাষ্ট্র এবং সমাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক :: টেলিভিশন নাট্যকার
ishak07khan@gmail.com  




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();