শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
সুশাসন ও সম্প্রীতি কোথায়
সাঈদ সাহেদুল ইসলাম
Published : Wednesday, 13 September, 2017 at 11:39 AM
সুশাসন ও সম্প্রীতি কোথায়
‘জীব হত্যা মহাপাপ’, ‘জীবে দয়া করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’- এ সব তো আমরা উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করি। উদ্ধৃতিতে খেলো কোনো বিষয় স্থান পায় না তা সবাই জানে। স্যামুয়েল ট্যাইলর কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার’ কবিতায়ও তাই রয়েছে- সামুদ্রিক পাখি অ্যালবাট্রসকে মেরে নাবিক কতই না শাস্তি পেয়েছেন। তাকে অবশেষে ক্ষমা করা হয় এমনকি কিছু সামুদ্রিক ছোট ছোট সাপের প্রতি ভালোবাসা দেখানোর কারণে। এটা ছিল সে কবিতার নৈতিক শিক্ষা, জীবের প্রতি দয়া দেখাতে হবে, কোনো জীবকে বিনা কারণে মন চাইলেই হত্যা করা যাবে না সে যে কোনো জীবই হোক না কেন। কিন্তু মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানুষের প্রতি যে নির্যাতন ও গণহত্যা চলছে, তা থেকে নৈতিকতার অবক্ষয়ের একটি পরিষ্কার চিত্র চেয়ে চেয়ে দেখছে এ বিশ্ব। তার চেয়েও বড়ই হাস্যকর বিষয় হচ্ছে, মানুষ যে জীব এটা ভুলে গেছেন মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি। বোঝা গেলো, তিনি গৌতম বুদ্ধের বাণী শোনেননি অথবা তার অজ্ঞতার কারণে তা শুনলেও অর্থ অনুধাবন করতে পারেননি! কিংবা এমনটি ভেবেছেন, শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন বলেই তো শান্তির সার্টিফিকেট পেয়ে গেছেন। তাই সে যতই অশান্তি সৃষ্টি করুন না কেন, সেটাও শান্তির!
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা মুসলিম। সু চি কি তাহলে এমন সাম্প্রদায়িক চিন্তা থেকেই সে মুসলিমদের নিধনকার্য শুরু করেছেন? হতে পারে তিনি সাম্প্রদায়িক। আর সু চিসহ কেউ যদি এটা মেনে না নেন, তবে রাশিয়ার বিশ্লেষক দিমিত্রি মোসিয়াকভের বিশ্লেষণটা সহজে মেনে নিতে পারেন। তিনি ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ অব দ্য রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স সেন্টার ফর সাউথ ইস্ট এশিয়া-অস্ট্রেলিয়া-ওশেনিয়া বিষয়ক পরিচালক। সে দেশের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, রোহিঙ্গা সংকট অন্ততপক্ষে একটি ত্রিমাত্রিক ঘটনা। প্রথমত, এটি চীনবিরোধী একটি খেলা। কারণ আরাকানে (রাখাইন রাজ্য) চীনের বিশাল বিনিয়োগ আছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুসলিম উগ্রপন্থা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশে এমনটি করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, আসিয়ানের মধ্যে অনৈক্য (মিয়ানমার এবং মুসলিমপ্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অনৈক্য) সৃষ্টির প্রচেষ্টা। তিনি আরো বলেন, ‘মিয়ানমারের সাবেক সেনাশাসক থান শুয়ের নামে প্রচুর সংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। পাশাপাশি আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চলে হাউড্রোকার্বন রয়েছে বলে অনেকটাই নিশ্চিত।’ মোসিয়াকভের এ তথ্য থেকে বোঝা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে শতাব্দী ধরে চলা এ সংঘাতকে ব্যবহার করেছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়নকগণ। রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকায় হাউড্রোকার্বনের বিপুল রিজার্ভের দিকে দৃষ্টি রয়েছে তাদের। গণমাধ্যমেও তাই প্রকাশ, ‘২০০৪ সালে রাখাইনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সম্পদের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে চীনের দৃষ্টি পড়ে। ২০১৩ সাল নাগাদ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শেষ করে দেশটি। এ পাইপলাইন মিয়ানমারের বন্দর শহর কিয়াউকফিউকে চীনের ইউনান প্রদেশের শহর কুনমিংকে যুক্ত করেছে। তেলের পাইপলাইনটির মাধ্যমে বেইজিং মালাক্কা প্রণালি হয়ে মিডল ইস্টার্ন ও আফ্রিকান তেল সরবরাহের সুযোগ পায় বেইজিং।’ এ সুযোগে আন্তর্জাতিক ক্রীড়নকরা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি উস্কে দিচ্ছে।
তাহলে সু চির সাম্প্রদায়িকতা বাদ দিয়েই বলি, মানুষ সে যে ধর্মেরই হোক না কেন মানবতাবাদ নামে তো কিছু একটা আছে। তা উপেক্ষা করে গণহত্যার আড়ালে এখন ভিন্ন রকম কিছু কৌশল নিচ্ছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অজস্র রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গারা ছুটে আসছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘের হিসাবমতে সে সংখ্যা তিন লাখ হোক বা তার কিছু কমবেশিই হোক, ঘটনা ঘটছে। এমন ঘটনাকে কতভাবে যে আড়ালের কৌশল করছে মিয়ানমার তা শুনে লজ্জায় পড়তে হয়। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন আড়াল করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ‘সন্ত্রাসবাদ দমনে সহায়তা’ চাওয়ার কূটনৈতিক কৌশল শুরু করেছে মিয়ানমার। নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বিজনেস ম্যাগাজিন ‘ফরবেস’-এ গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইন রাজ্যে নির্যাতনের খবর বিশ্বজুড়ে প্রচারের মধ্য দিয়ে আগামী দিনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মিয়ানমারের সামনে চলে আসছে। প্রথমত, মিয়ানমারের বিদেশি বন্ধুরা স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির ওপর দ্রুতই আস্থা হারাতে পারেন। দ্বিতীয়ত, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মিয়ানমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন এবং তৃতীয়ত, মিয়ানমারকে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে হতে পারে। রোহিঙ্গা হত্যায় আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলায় প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে পক্ষে রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছে মিয়ানমার। এর অংশ হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আরো বেশি আকর্ষণ করতে উদারনীতির কথাও জানাচ্ছে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আরো জানা যায়, জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ অধিবেশনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ তাদের ভাষায় ‘রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাস দমনে’ সমর্থন আদায়ের বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ জন্য নিউ ইয়র্কে ইয়াংগুনের কূটনীতিকদের ব্যাপক দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যাচ্ছে। মানবতাবাদের বিপর্যয় ডেকে এনে মিয়ানমারের নেত্রী সু চি যে কৌশল অবলম্বন করছেন তা দেখে একজন নিরক্ষর মানুষও লজ্জা পাবে বলা যায়। ক’দিন আগে তাই এমন খবরও পড়তে হয়েছে তার বিশ্বশান্তি নোবেল ফেরত নিতে কয়েক লাখ আবেদনও জমা পড়েছে। তা কি সম্ভব হবে নোবেল কমিটির দ্বারা? ধরুন, যদি ফেরত নেওয়াই হয় তবে ‘না পাওয়ার ব্যথা যদিও বা সয়/ পেয়ে হারানো সে যে বড় ব্যথাময়’ এমন কোনো অনুভূতি দ্বারা ব্যথা বা লজ্জা পাবেন কি সু চি?  
রোহিঙ্গারা প্রতিদিন বিভিন্ন সীমানায় বাংলাদেশে ঢুকছে প্রাণ বাঁচাতে। মানবিক দিক বিবেচনায় কেউ বাধা না দিয়ে সাহায্যও করছেন হয়তো বা। কিন্তু এর ভার সামলানো কি বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব? ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ শুক্রবার দুপুরে আখাউড়ায় এক অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, ‘আমাদের এ ছোট দেশ এত রোহিঙ্গার চাপ নিতে পারবে না। তাদের সারাজীবনের জন্য রেখে দেওয়ার শক্তি আমাদের নেই। আমাদের যেটুকু আছে তা দিয়ে কিছু সময় তাদের সাহায্য করতে পারবো। বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান জানাই মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন রোহিঙ্গাদের রাখাইন রাজ্যে ফিরিয়ে নিতে।’ কিন্তু কে এগিয়ে আসবেন? বিশ্বে যারা ভালো বোঝেন দাবি করেন তাদেরই বা মানবতাবাদের জ্ঞান কোথায়?

লেখক :: কলেজ শিক্ষক, রংপুর
sayedsahedul@gmail.com




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();