বুধবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৭
পাশবিক শক্তির পদতলে মানবতা
মনোজিৎকুমার দাস
Published : Wednesday, 13 September, 2017 at 11:36 AM
পাশবিক শক্তির পদতলে মানবতা
সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানবিক গুণাবলি মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মানুষই একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী। পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত একদল মানুষ তাদের মেধা মনন, চিন্তা চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে মানবজাতির জন্য অভাবনীয় অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে, অপর একদল মানুষ আদিমকাল থেকে আজকের একবিংশ শতকেও আসুরিক শক্তি প্রয়োগ করে পৃথিবীতে অশান্তির বীজ বপন করেই চলেছে।
প্রযুক্তির উন্নতি ও শ্রমশক্তির কল্যাণে দুনিয়াজুড়ে উৎপাদন ও সম্পদ বাড়ছে ও এখনো বাড়ছে। কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক ন্যায় কমছে, অন্যায় বাড়ছে। এটা বৈশ্বিক ক্ষেত্রে যেমন স্বদেশের ক্ষেত্রেও তেমনই। বৈশ্বিক ক্ষেত্রে সারা পৃথিবী আজ গ্লোবাল ভিলেজের অন্তর্গত হলেও তা নামসর্বস্ব। তথাকথিত বিশ্বায়িত বিশ্বে আজ শান্তির বাতাবরণ নেই। রাষ্ট্রগুলো আজ নানা গোষ্ঠীতে বিভক্ত। ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য বিভিন্ন রাষ্টীয় গোষ্ঠী চরম সংঘাত ও খুনখারাবিতে লিপ্ত। অন্যদিকে এক একটা রাষ্ট্রের ভেতরে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় কারণে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, সংঘাতের ফলে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা, নির্যাতন, বিতাড়ন চলছে।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে লড়াই, সংঘাত রোধ করার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই জাতিসংঘ গঠিত হয়। কিন্তু জাতিসংঘ লড়াই, সংঘাত রোধে কতটা ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে তা আমরা স্পষ্টভাবেই দেখতে পারছি। জাতিসংঘ গঠনের পর থেকেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলোই জাতিসংঘের মোড়লিপনার দায়িত্বে আছে। ওইসব মোড়ল রাষ্ট্রগুলোই এক সময় দেশে দেশে ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই সব রাষ্ট্র আজ কৌশলে বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোকে কব্জা করে রেখেছে। অতীতের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বিংশ শতাব্দীতে দুই দুটো বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীতে মানবতা পাশবিক শক্তির পদতলে কীভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী যে গণহত্যাযজ্ঞ চালায় তা ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের পর বিজয়ী মিত্রবাহিনীর জয়জয়কার হয়। বিজয়ী মিত্রবাহিনীর দেশগুলোর মধ্যে মতাদর্শগতভাবে বিভেদ থাকলেও একনায়ক স্বৈরশাসক হিটলারকে পদানত করার জন্য তারা একাট্টা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয় লাভের পর থেকে বিজিত সম্পদ, ভূখণ্ড ও মানবসম্পদকে ভাগবাটোয়ারা করে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা আর একাট্টা থাকে না।
বামপন্থার ধারক ও বাহক সোভিয়েত রাশিয়া ও তার দোসররা, ধনতন্ত্রবাদের ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্র ও দোসররা হিটলারের অক্ষশক্তিকে মিলিতভাবে পরাজিত করার পর স্ব স্ব মতবাদে বলিয়ান হয়ে অক্ষশক্তির অন্যতম রাষ্ট্র জার্মানির ওপর আধিপত্য কায়েম করে।
জার্মানিকে দ্বিখণ্ডিত করে জার্মানির বার্লিন শহরে প্রাচীর তুলে দিয়ে একদিকে বামপন্থীদের আর অন্যদিকে ধনতন্ত্রবাদীদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করে। ইহুদি বিদ্বেষী হিটলার ইহুদি নিধনে মারণযজ্ঞ চালানোর পর বেঁচে যাওয়া ইহুদিরা বিভিন্ন ধনতান্ত্রিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় ধনতান্ত্রিক দেশেগুলোই ইহুদিদের পিতৃভূমি এ যুক্তি খাড়া করে মুসলিম অধুষিত প্যালেস্টাইনের এক অংশে ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে সংঘাত চলে আসছে। প্রতিনিয়ত মানুষ মরছে, ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হচ্ছে, স্বভূমি থেকে মানুষ বিতাড়িত হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ার ফলে সারাবিশ্ব আজও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তেল সম্পদে সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে সহিংসতা চলছে বছরের পর বছর। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশে মারণাস্ত্রের খেলায় লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ-শিশু নিহত হয়েছে। সেই খেলা আজও বন্ধ হয়নি।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বের বামপন্থীদের ক্ষমতার হ্রাস পায়। অন্যদিকে, ধনতন্ত্রের প্রতিভূ মার্কিন যুক্তরাষ্টের ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। তারা সারাবিশ্বকে এক গ্লোবাল ভিলেজে রূপান্তর করে মুক্তবাজার অর্থনীতির আওতায় আনে। এতে বিশ্বের গরিব দেশগুলো কতটা লাভবান হয়েছে তা ভাববার বিষয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালপর্বে অদ্যাবধি বিভিন্ন দেশে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলছে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়নের ফলে মানবতা কি ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে না? গত ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের কয়েকটি তল্লাশিচৌকিতে উগ্রবাদীদের হামলার সূত্র ধরে রাখাইন রাজ্যে দমন অভিযান শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও পুলিশ। এরপর থেকেই প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকায় রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা অব্যাহত আছে। এ রোহিঙ্গাদের বড় অংশই রাস্তার ধারে বা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে দলে দলে বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে নতুন শরণার্থীর সংখ্যা তিন লাখে পৌঁছেছে। মানবতা পাশবিক শক্তির পদতলে পিষ্ট হচ্ছে।
আজ প্রযুক্তির উন্নতি ও শ্রমশক্তির কল্যাণে বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ও সম্পদ বাড়ছে। কিন্তু সামাজিক ন্যায় কমছে, অন্যায় বাড়ছে। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে প্রগতিবিমুখতা ও অনাচার, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবিগ্রহ, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদকদ্রব্যের প্রসার, নৈতিক অবক্ষয়, অসামাজিক কার্যকলাপ, নারী নির্যাতন, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, জুলুম-জবরদস্তি, অপব্যবস্থা, দুর্নীতি আজ বিশ্বসমাজকে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা ও কর্মস্পৃহার অভাবে ও সাম্রাজ্যবাদী তৎ্পরতার কারণে ইতিহাসের চাকা পেছন দিকে ঘুরছে। মধ্যযুগের পরাজিত সব সংস্কার, বিশ্বাস ও ভাবধারা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। নৈরাজ্যবাদ ও শূন্যতা সামনে এসেছে। মানুষ এখন সংঘবদ্ধ হতে চায় না, রাজনৈতিক দলও চায় না, একলা চলতে চায়।
অন্যদিকে, সর্বজনীন গণতন্ত্রের ইতিবাচক রূপরেখায় চালিত কার্যক্রম অপরিহার্য হলেও কায়েমি-স্বার্থবাদীদের কূটচালে জনসাধারণকে হুজুগে মাতিয়ে স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের ভেকধারী গণতন্ত্রকামীরা। ফলে আজ বিশ্বের অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের জনসাধারণ পদে পদে অবদমিত হচ্ছে।

লেখক :: স্কুলশিক্ষক, মাগুরা
monojitdas1947@gmail.com




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();