বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
জনসংখ্যার ভার
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
Published : Monday, 17 July, 2017 at 11:28 AM
জনসংখ্যার ভার
বাংলাদেশ একটি ছোট্ট ভূখণ্ড। এই ভূখণ্ডের অনুপাতে জনসংখ্যার হার এখন অনেক বেশি এবং যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে তাতে আগামী দু’দশকে আমাদের জন্য সার্বিক পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাবে এই আশঙ্কা মোটেও অমূলক নয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঊর্ধ্বমুখী হারের পরিপ্রেক্ষিতে ‘দুই সন্তানের বেশি নয়’- এই নীতি গ্রহণ করে জনসংখ্যা কমাতে নানামুখী উদ্যোগ চলে আসছিল। এর সুফলও মিলেছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এই উদ্যোগে ভাটা পড়ায় এখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে সমাজ গবেষকদের কপালে। ১৯৭৫ সালে দেশে গড় প্রজনন হার ছিল ৬.৩। ২০১১ সালে তা নেমে আসে ২.৩-এ। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের অভিমত বাংলাদেশের জন্য এটাই ছিল প্রত্যাশিত হার। কিন্তু তা হঠাৎ করে অত্যন্ত বেড়ে  যায় এ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়ার কারণে।
বর্তমান বিশ্ব নানা কারণে টালমাটাল। জাতিবিদ্বেষ ও ধর্মান্ধ সহিংস রাজনীতির কারণে মানুষই মানুষের জন্য এখন হুমকি হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বড় কথা প্রাকৃতিক কারণেই বসবাসের এই পৃথিবী নামক গ্রহটি ক্রমশ বসবাস অযোগ্য হয়ে উঠতে শুরু করেছে। জাতিসংঘ প্রদত্ত নতুন তথ্য আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। এই তথ্যটি আমাদের শঙ্কা সঙ্গত কারণেই বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যা ২০৫০ সালে হাজার কোটিতে পৌঁছতে পারে। জাতিসংঘ জানিয়েছে বর্তমান হারে জনসংখ্যা বাড়তে থাকলে ২০৩০ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৮৬০ কোটি, ২০১৫ সালে ৯৮০ কোটি এবং ২১০০ সালে তা বেড়ে হবে ১ হাজার ১০২ কোটি। উল্লেখ্য, বর্তমান পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭৬০ কোটি। বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক জনবসতিপূর্ণ (ভৌগোলিক দিক থেকে) দেশ। আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩০০০ ভাগের একভাগ মাত্র। কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম দেশ। নিঃসন্দেহে এই বার্তা আমাদের জন্য কোনোভাবেই প্রীতিকর নয়।
পারমাণবিক অস্ত্র অপেক্ষা জনসংখ্যা বর্তমান বিশ্বের প্রধান সমস্যা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা গোটা পৃথিবীর জন্য হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অত্যন্ত বেশি। এর কারণ হিসেবে ভৌগোলিক পরিবেশ, অশিক্ষা, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাব, বাল্যবিয়ে, বহুবিয়ে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রভৃতিকে দায়ী করা হয়। জনসংখ্যা ক্রমবৃদ্ধির কারণে বিশ্বে যেসব সংকট দেখা দেবে সেগুলোর বড় শিকার হবে আমাদের দেশের মতো জনভারাক্রান্ত দেশগুলোই। ভারাক্রান্ত পৃথিবীর কথা ভাবার পাশাপাশি আমাদের বিষয়টি শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার যেখানে প্রতিনিয়তই বৃদ্ধি পাওয়া উচিত ছিল সেখানে দিনদিনই তা কমেছে। বাল্যবিয়ে এখনো রোধ করা যায়নি। আরেক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী নারীদের ৬২ শতাংশই জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর দুষ্প্রাপ্যতাও বহুলাংশে দায়ী। প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ দম্পতির চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তাদের পরিবার কল্যাণে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অভিযোগ আছে যে, পরিবার কল্যাণ সহকারী ও মাঠকর্মীরা এখন আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দেন না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী তিন দশকে আমাদের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ কি পারবে সেই বিপুল জনসংখ্যার ভার বইতে? শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধিই নয় কর্মসংস্থান এবং বেঁচে থাকার তাগিদে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। তাদের মধ্যে রাজধানীমুখী স্রোতই সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অনেক এলাকা এখনই চাষাবাদ ও বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। ফলে যে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে তা অচিন্তনীয়। কাজ ও খাদ্য সংকট যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছাবে এবং পরিবেশের যে বিপর্যয় ঘটাবে তাতে সব ধরনের শৃঙ্খলাই ভেঙে পড়তে পারে। এই অবস্থা মোকাবেলার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন আমরা কি সেভাবে প্রস্তুত হচ্ছি? জবাব এটাই- না।
বর্ধিত জনসংখ্যার এই বিরাট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সঠিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে অতিদ্রুত নতুন কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। উপকূলীয় এলাকায় মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় মানুষের জানমাল রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। ভিক্ষুকের হাতকে পরিণত করতে হবে কর্মীর হাতে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতেই এ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এসে দেখা যায় ২০১০ সালে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ব্যর্থ হয়ে পড়ে। এরপর থেকে জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ ঠেকানো যাচ্ছে না। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করতে পারলে হয়তো এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। কিন্তু যেহেতু জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি সে কারণে বাড়তি জনসংখ্যা এখন দেশের জন্য বোঝা হয়ে দেখা দিয়েছে।
একদিকে দেশে অপরিকল্পিত আবাসন ও শিল্পের কারণে জমির পরিমাণ কমছে। অন্যদিকে জমি কমে যাওয়ার কারণে কমছে উৎপাদন। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে দেশে দেশে খাদ্য নিরাপত্তা স্বাভাবিক কারণেই পড়েছে হুমকির মুখে। অধিক জনসংখ্যা এই হুমকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমেই অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদনের ওপরই নির্ভর করতে হবে। বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে হয়তো আপতকালীন খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করা যায় কিন্তু স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে সেটা সম্ভব নয়। কারণ, আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হয় বিদেশের সাহায্যের ওপর। সে ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে না পারলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দুরূহ। আবার জনসংখ্যার চাপ কমাতে পারলে বর্তমান উৎপাদন দিয়ে হয়তো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতো।
পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম যে ব্যর্থ সেটা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়। এক বছরে যেখানে দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে ২০ লাখের উপরে সেখানে আগামী ২০ বছর পর অবস্থা কী হবে তা খুব সহজেই অনুমেয়। এখনই এ বিষয়ে পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে না পারলে জনসংখ্যার  এই ভার হয়তো আগামীতে বহন করাটাই বাংলাদেশের জন্য একবারেই অসম্ভব হয়ে পড়বে। এসব বিষয়ে এ যাবত কথাবার্তা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু কাজের কাজ যে তেমন কিছুই হয়নি বিদ্যমান বাস্তবতা তো এরই সাক্ষ্যবহ। এবার কালবিলম্ব না করে কাজের কাজগুলো দ্রুত সম্পাদন করা জরুরি। বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করতে হলে- দূরদর্শী পরিকল্পনার ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে জোরদার কর্মসূচি নিতে হবে। দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী করতে হবে সহজলভ্য। এখনো জনসংখ্যা কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও তদারকির সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার পদ শূন্য রয়েছে। জনসংখ্যাবিষয়ক সবচেয়ে বড় নীতি-নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ প্রায় অকার্যকর। এসব প্রতিবন্ধকতা জিইয়ে রেখে আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব কার্যক্রম ও উচ্চারণ সর্বস্ব অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সুফল পাওয়ার আশা একেবারেই দুরাশার নামান্তর। বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারকে অবশ্যই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ বিষয়টাকে প্রাধান্য দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক :: সাংবাদিক ও কলাম লেখক
deba_bishnu@yahoo.com




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();