বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
বাংলাদেশ-শ্রীলংকা সম্পর্কে নতুন মোড়
লাবণ্য রায়হান
Published : Monday, 17 July, 2017 at 11:25 AM
বাংলাদেশ-শ্রীলংকা সম্পর্কে নতুন মোড়
বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলংকা। ঐতিহাসিকভাবেই দুই দেশের সম্পর্ক উষ্ণ। বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের কারণেও উভয় দেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। দুই দেশের বিদ্যমান এই সম্পর্ক আরো গতিশীল ও উষ্ণ হলো, সম্প্রতি শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে। শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের এই সফরে উভয় দেশের মধ্যে ১৪ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইসহ ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ (এফটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছে উভয় দেশ। এই চুক্তিটি এ বছরের মধ্যেই সম্পাদিত হবে এমন আশাবাদের কথা উচ্চারিত হচ্ছে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক চুক্তি, যেমন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টস বা এফটিএ) কিংবা বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (ফরেইন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট বা এফডিআই) ইত্যাদি হচ্ছে দ্বিপাক্ষিকতার সাধারণ উদাহরণ। যেহেতু অধিকাংশ অর্থনৈতিক চুক্তি রাষ্ট্রদ্বয়ের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের দিকে খেয়াল রেখেই তৈরি হয়, সেহেতু দ্বিপাক্ষিকতার মাধ্যমে চুক্তিভুক্ত উভয় রাষ্ট্রই সুবিধা লাভ করে থাকে। সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও আন্তরিকতায় বাংলাদেশ বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার মহাসড়কে ধাবমান। এক্ষেত্রে শ্রীলংকার সঙ্গে ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
গত শুক্রবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থনৈতিক ও কৃষি খাতে সহযোগিতা, উচ্চশিক্ষা, বিনিয়োগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, উভয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে, পররাষ্ট্র সেবাবিষয়ক ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বিস’ ও শ্রীলংকার এলকেআইআইআরএসএসের মধ্যে, রেডিও, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র, দু’দেশের মান নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান, সংবাদ সংস্থা এবং চট্টগ্রাম বিজিএমইএ ফ্যাশন ইনস্টিটিউট এবং শ্রীলংকা টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল ইনস্টিটিউটের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া দুই দেশের কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের ভিসাবিহীন চলাচলের জন্য একটি চুক্তিও সই করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শ্রীলংকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে যেমন উভয় দেশের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, তেমনিভাবে বিশেষজ্ঞরাও চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করেছেন। তাতে এগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উভয় দেশের সম্পর্ক আরো একধাপ এগিয়ে যাবে- এমনটি ধারণা যৌক্তিক।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে মাত্র আট কোটি মার্কিন ডলার। বহুদিন ধরেই এমনটি উচ্চারিত হয়ে আসছে, এই বাজার আরো বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। উভয় দেশের পক্ষ থেকেই বিষয়টি খতিয়ে দেখার প্রস্তাব চলে আসছে কয়েক বছর ধরে। এছাড়া শ্রীলংকার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত যেসব চলমান চুক্তি রয়েছে তাতে শুল্ক-অশুল্ক ব্যবস্থা নিয়েও নানা জটিলতা বিদ্যমান। এখন দেশটির সঙ্গে ‘মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’ হলে, বিদ্যমান বাধাগুলোর অপসারিত হবে এমন আশা করছেন করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে দেশ এ পথে এগিয়ে গেলে এতে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরো মজবুত হবে- এমন আশা করা যাচ্ছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের সিরামিকস, সবজি, প্লাস্টিক পণ্য, ওষুধ, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, ফুটওয়্যার, লোহা ও স্টিল রপ্তানির চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে মুক্ত বাণিজ্য সুবিধায় এসব পণ্য রপ্তানির সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যৌক্তিক। এছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কথা বলাই বাহুল্য। তৈরি পোশাক খাতসহ আরো যেসব শিল্প খাত রয়েছে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় এসব পণ্যের সম্ভাবনা খুঁজে দেখে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হতে পারে বলেও ধারণা করা যায়। মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের বৈঠকেও রাষ্ট্রপতি এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে কারো এফটিএ নেই। ফলে চলতি বছর শ্রীলংকার সঙ্গে এফটিএ স্মাক্ষরিত হলে তা হবে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো দেশের প্রথম এফটিএ। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হলে তা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যদিও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আর বহুদেশীয় সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, যুদ্ধপূর্ব দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ফলেই যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পয়ে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নেতিবাচক হিসেবে মনে করায় বহুদেশীয় লীগ অব ন্যাশনস গঠিত হয়। যদিও বহুদেশীয় লীগ অব ন্যাশনস গঠনের ২৬ বছরের মধ্যেই তা ভূমিকাহীন হিসেবে প্রমাণিত হয়। আর বিশ্ব গণতন্ত্র যুগে প্রবেশ করার পর থেকেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবারো বেগবান হতে শুরু করে। লক্ষণীয় যে, জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ইত্যাদি উচ্চপর্যায়ের আধুনিক বহুদেশীয় সংস্থা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ কূটনীতি দ্বিপাক্ষিক পর্যায়েই হয়ে আসছে। কেননা, দ্বিপাক্ষিকতার মধ্যে কিছুটা নমনীয়তা এবং আপস-নির্ভর ব্যবস্থা থাকে; যা বহুদেশীয় ব্যবস্থায় কার্যত অনুপস্থিত। এ জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নকামী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। সরকার যেহেতু ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কাতারে নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর, সেক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুদেশীয় উভয় সম্পর্কই আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে শ্রীলংকা তেমনি একটি বন্ধু দেশ, ইংরেজদের উপনিবেশের বেশ আগে থেকেই এই দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন রয়েছে। এছাড়া ২০০৮ সালে উভয় দেশের প্রধান বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সংযোগ বৃদ্ধিতে, নতুন বিমানসংস্থানের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা করে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার বিনিয়োগ রয়েছে পোশাক এবং ব্যাংকিং খাতে। উভয় দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা যৌথ কর্মী সংগঠনও গঠিত হয়। তখন উভয় দেশই শিপিং চুক্তি সই করার জন্য সম্মত হয়। ফলে সেদেশের প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরে এই সম্পর্কে নতুন মোড় আনবে এটাই স্বাভাবিক।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চুক্তিগুলো সম্পাদনের মধ্য দিয়ে ঢাকা ও কলম্বোর মধ্যে প্রথাগত বাণিজ্য সহযোগিতা এখন দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন সহযোগিতায় বিস্তৃত হয়েছে ঠিকই, আর এর সফলতা নির্ভর করছে এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর। এটা ঠিক যে, দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য খুবই কম। আর বাণিজ্য বাড়ানোর লক্ষ্যেই এফটিএ-তে উভয় দেশ সম্মত হলো। অন্যদিকে সই হওয়া চুক্তিগুলোর মধ্যে সাতটিই ব্যবসা ও বিনিয়োগ বিষয়ে। মোট কথা শ্রীলংকার প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, তা বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রোডম্যাপ বলেও বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমানে বিশ্ব বাণিজ্য এখন এক ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক দেশকেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর কিছুটা নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। ফলে শ্রীলংকার সঙ্গে এই চুক্তি সম্পাদিত হলে তা দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধাগুলোও অপসারিত হবে।
সর্বোপরি বলতে চাই, উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক নানামুখী সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করতে চুক্তিগুলো যেমন জরুরি তেমনিভাবে এর যথাযথ বাস্তবায়নও প্রত্যাশিত। বাংলাদেশের সিরামিকস, সবজি, প্লাস্টিক পণ্য, ওষুধ, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, ফুটওয়্যার, লোহা ও স্টিল রপ্তানির চমৎকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে শ্রীলংকার বিনিয়োগ রয়েছে, এ খাতের বিনিয়োগ আরো বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়ার মহাসড়কে হাঁটছে সেহেতু মুক্ত বাণিজ্য সেখানে অবদান রাখতেই পারে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের উন্নয়নে কতটা আন্তরিক, তা দেশের বিভিন্ন খাতের দৃশ্যমান উন্নয়নের মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত। এরপরও শ্রীলংকার সঙ্গে আমাদের দেশের বহুমুখী সম্পর্কের নবতর এ যাত্রার সুফল তুলে আনতে সংশ্লিষ্টরা যে আরো আন্তরিক হবেন- সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। দেশবাসী প্রত্যাশা করে, দু’দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হয়ে জাতীয় অর্থনীতি এগিয়ে যাক। আমাদের প্রিয় দেশ উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করুক, যাতে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমরা বিশ্ববাসীর সামনে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।

লেখক :: প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী
 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();