শুক্রবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭
স্বাধীনচেতা কবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী
মীম মিজান
Published : Monday, 17 July, 2017 at 11:23 AM
স্বাধীনচেতা কবি ইসমাইল হোসেন শিরাজী
প্রখ্যাত কবি ইসমাঈল হোসেন শিরাজী ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই তৎকালীন পাবনা জেলার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার ভালো নাম ছিল গাজী-এ-বলকান মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। শিশু ইসমাইল হোসেনের লেখাপড়ার প্রথম সবক দেন তার মা নূরজাহান খানম। মেধাবী ইসমাইল হোসেন অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে সিরাজগঞ্জের বিএল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণে এ সম্ভাবনাময় তরুণ লেখাপড়ার ক্ষেত্রে আর অগ্রসর হতে পারেননি। তাছাড়া স্বদেশের পরাধীনতা, সমগ্র মুসলিম জাহানের দুর্দশার জন্য বেদনাবোধ হতে সৃষ্টি উৎকণ্ঠাও তাকে স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে বসে থাকতে দেয়নি।
তিনি এ সময়ে নির্যাতিত অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও পদদলিত মুসলিম জাতির জন্য বেদনাবিধুর, এতই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এ যাত্রায় তিনি তুরস্কে যেতে পারেননি ঠিক কিন্তু সেই যে মুসলিম জাহানের কল্যাণের মানসে ঘর হতে বের হলেন আর কখনই সুবোধ বালকের মতো ঘরে বসে থাকেননি। অবশ্য তিনি পরবর্তীকালের তার বাল্যকালের স্বপ্নের তুরস্কে গিয়েছিলেন তা অনেক পরের কথা।
ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সর্বাধিক জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘অনল প্রবাহ’। এটি ১৮৯৯ সালে মুন্সী মেহেরউল্লা প্রথম প্রকাশ করেন। পুস্তিকাটি এত জনপ্রিয় হয়েছিল ১৯০০ সালে আরো কিছু কবিতা নিয়ে নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯০৮ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। এ সময়ই ‘অনল প্রবাহ’ ও লেখক ব্রিটিশ রাজশক্তির আক্রমণের শিকার হন। ‘অনল প্রবাহ’ বাজেয়াপ্ত হয় এবং লেখকের দু’বছর কারাদণ্ড হয়। তিনিই প্রথম কবি যার কাব্যগ্রন্থ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয় এবং তিনিই ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগকারী উপমহাদেশের প্রথম সাহিত্যিক।
১৯৪০ সালের ২২ মার্চ কলকাতা ২/ ১ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে, সিরাজী পাবলিক লাইব্রেরি ও ফ্রি রিডিং রুমের উদ্বোধন করা হয়। দ্বারোঘাটন অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে বলেন, ‘সিরাজী সাহেব ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। তিনি আমাকে ভাবতেন জ্যেষ্ঠ পুত্র-তুল্য। তার নিকট যে স্নেহ আমি জীবনে পেয়েছি তা জীবনের পরম সঞ্চয়। ফরিদপুর কনফারেন্সে তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তার সমগ্র জীবনই ছিল অনল প্রবাহ এবং আমার রচনায় সেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের প্রকাশ আছে। সাহিত্যিক ও রাজনীতিক ছাড়াও আমার চোখে তিনি প্রতিভাত হয়েছিলেন এক শক্তিমান দরবেশ রূপে। মৃত্যুকে তিনি ভয় করেননি, তুরস্কের রণক্ষেত্রে তিনি সেই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাই অন্তিমে মৃত্যু তার জন্য এনে দিয়েছিল মহাজীবনের আস্বাদ।’
বাংলাদেশের জন্য বড় দুর্ভাগ্য- আমাদের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা মহান পুরুষ শিরাজীকে হীনম্মন্যতার কারণে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। দেশের মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পাঠ্যসূচিতে শিরাজী রচনাবলি উপেক্ষিত। শিরাজীর লেখা থেকে বঞ্চিত এদেশের শিক্ষার্থীরা। শিরাজী সম্পর্কে তরুণ সমাজকে জানতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ শিরাজীর অনলবর্ষী বক্তৃতায় প্রকম্পিত হয়েছিলো ব্রিটিশ সিংহাসন। তার কণ্ঠ ও লেখা থেকে বারুদের গন্ধ বের হতো। তার বক্তৃতায় জেগে ওঠেছিল লাখো লাখো তরুণ। সেখানে মুসলিম বা হিন্দু বলে কোনো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়নি। ব্রিটিশরাজ শুধু তাকে কারাবন্দিই করেনি, তার কবিতাও নিষিদ্ধ করেছিল। সেই স্বাধীনচেতা মহাকবিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা অবমূল্যায়ন করছেন।
ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এস. এম. লুৎফর রহমান লিখেছেন- ‘বাংলাদেশি জাতি সৃষ্টির এই গঠনকালে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উদারতা, দৃঢ়তা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাতন্ত্র্যবাদ, ঐতিহ্য চেতনা, সংস্কৃতি চেতনা, বিজ্ঞান-ইতিহাস ও সাহিত্য-চেতনা প্রভৃতি থেকে প্রেরণা আহরণ একান্ত কর্তব্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত উপমহাদেশের মুসলমানদের মনে যে জাতীয় ঐক্যবোধ, জাগরণ স্পৃহা আপন জাতীয় সত্তার পরিচয় ফুটিয়ে তোলার আকাক্সক্ষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে যে প্রতিষ্ঠা অর্জনের প্রয়াস তীব্র আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবোধের প্রেক্ষিতে সেই উদ্যম নিষ্ঠা ও কর্ম-চাঞ্চল্য একান্ত আবশ্যক হয়ে উঠেছে। আবশ্যক হয়ে উঠেছে আজ আবার নতুন করে ঘনিয়ে ওঠা বিভ্রান্তির, দিশাহীনতার দিগন্তের কালো আবরণ ভেদ করে আলোকবন্যা আবাহনের জন্য নতুন করে গর্জে ওঠা হাজার হাজার সিরাজীর।’
এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শিরাজী একজন স্বাধীনচেতা কবি ও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার বিদ্রোহী কবি। মাত্র ৫২ বছর বয়সে ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মুসলিম বিশ্বের এই মহান পুরুষ ইন্তেকাল করেন। জীবনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত তিনি সর্বপ্রকার অনাচার, কদাচার, কুসংস্কার, অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সিংহের মতো লড়ে গেছেন। কোথাও, কোনো কারণে তিনি মাথা নত করেননি। আজ সেই স্বাধীনচেতা কবির ৮৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই প্রয়াণ দিবসে আমরা শপথ নিই দেশপ্রেমিক হওয়ার। তার মূল্যবান সাহিত্যকর্মের ব্যাপক পঠন ও গবেষণার দাবি রাখে।

লেখক
:: এম ফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();