বুধবার, ২৬ জুলাই, ২০১৭
অবহেলিত মুচি-নরসুন্দর-হরিজন ও বেদেদের জীবনচিত্র
তানজেরুল ইসলাম, গাজীপুর
Published : Monday, 17 July, 2017 at 11:18 AM, Update: 17.07.2017 11:40:24 AM
অবহেলিত মুচি-নরসুন্দর-হরিজন ও বেদেদের জীবনচিত্র
সমাজের মানুষের বাঁকা দৃষ্টি আর তুচ্ছতাচ্ছল্য উপেক্ষা করেই দিন কেটে যাচ্ছে সংবাদের বাইরের জগতের কিছু পেশাজীবী মানুষের। তারা অন্যকে পরিপাটি করে সাজাতে নিবেদিত হলেও সমাজে অবহেলিত ও নিগৃহীত। তবুও শত লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার পরও দলিত পেশায় নিবেদিত গাজীপুরে হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ সমাজকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আধুনিক সভ্যতার দিকে।
মুচি সম্প্রদায় : মুচি নামটা শুনলে অনেকেই এ পেশায় নিয়োজিতদের নীচু জাতের সনাতনধর্মী ভেবে থাকেন। তবে ইদানীং মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মের যুবক এ পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন। এ পেশায় নিয়োজিতরা সমাজে অত্যন্ত নীচু শ্রেণির হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ মুচির কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেও লজ্জাবোধ করেন। অথচ চলার পথে হুট করে পথে জুতা-স্যান্ডেল ছিঁড়ে গেলে মুচির কদর বাড়ে। এ ছাড়াও জুতা-স্যান্ডেল পালিশ করে চাকচিক্য করা থেকে শুরু করে নতুন জুতা-স্যান্ডেল দীর্ঘদিন ব্যবহারের জন্য সেলাই করতেও মুচির কাছে যেতে হচ্ছে। তবে অনেকেই মুচি ও চামারকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। প্রকৃত অর্থে মুচি ও চামার পৃথক দুটি সম্প্রদায়। কিন্তু তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ। চামার সম্প্রদায় পশুর চামড়া সংগ্রহ করেন। আর মুচিরা চামার কর্তৃক সংগৃহীত চামড়া ব্যবহারোপযোগী করে তোলেন কিংবা বিক্রির জন্য ট্যানারিতে নিয়ে যান। ঐতিহাসিকভাবে মুচিরা হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তারা নিম্ন শ্রেণির ও সামাজিকভাবে ‘অস্পৃশ্য।’ অতীতে মুচিরা একত্রিতভাবে একটি আলাদা সমাজে বসবাস করলেও বর্তমান আধুনিকসভ্যতায় হারিয়ে হাচ্ছে মুচিপাড়া। অনেকের কাছে মুচিপাড়া ঋষিপাড়া নামেও পরিচিত।
জানা গেছে, কাশ্যপ এবং শান্ডিল্য নামে দুটি শ্রেণিতে মুচি সম্প্রদায়কে ভাগ করা হয়েছে। এদের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কে বাধানিষেধ নেই। ব্যভিচারের অভিযোগে বিয়েবিচ্ছেদ ঘটে এবং পুনঃবিবাহের বিধানও রয়েছে। অধিকাংশ মুচি শিব সম্প্রদায়ভুক্ত। তবে মুচি সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ বৈষ্ণব।
অবহেলিত মুচি-নরসুন্দর-হরিজন ও বেদেদের জীবনচিত্র
সুকুমার দাশ জানান, তিনি এ পেশায় দীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিয়োজিত রয়েছেন। তার বাবা মোহন দাশের কাছে তার হাতেখড়ি। নিয়মিত যাদের জুতা-স্যান্ডেল কালি করেছেন তাদের অনেকের ভাগ্য পরিবর্তন হতে দেখেছেন। কিন্তু তার ভাগ্য আগের মতোই আছে। পেটে ক্ষুধা ও সন্তানের লেখাপড়ার কথা ভেবে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে তার নিত্যদিনের কর্মজীবন অতিবাহিত হচ্ছে। অসুস্থ হলে বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। তখন অর্ধহার-অনাহারে দিন কেটে যায়। দিন কামলা বলে প্রতিবেশীরাও ধার দেয় না। সঞ্চয় কিংবা সম্পদ বলেতে নিজের জীবনটাই।
নরসুন্দর সম্প্রদায় : নরসুন্দরা যেখানে চুল ছাঁটেন, তাকে সাধারণত বার্বার শপ বা হেয়ার স্যালুন অথবা শুধু স্যালুন বলা হয়ে থাকে। গাজীপুর মহানগরসহ উপজেলার সেলুনগুলোতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও নরসুন্দরদের ভাগ্য আগের মতোই আছে। প্রবীণ নরসুন্দর বিনম্র শীল জানান, তিনি পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে নরসুন্দরের কাজ করছেন। বাবা হরিপদ শীলের কাছে তার হাতেখড়ি। বাল্যকালে তিনি দেখেছেন, টাঙ্গাইলের বিভিন্ন বাজারে হাটের দিনে নরসুন্দররা সারিবদ্ধভাবে বসে থাকত। তখন কোনো স্যালুন ছিল না। সবাই মাটিতে বসে চুল-দাড়ি ছাঁটতো। তবে ধনীরা বাড়িতে নরসুন্দরদের ডেকে নিয়ে যেতো। অতীতে ধানের মৌসুমে নরসুন্দরদের এককালীন ধান দিয়ে সারাবছর পরিবারের পুরুষ সদস্যদের চুল-দাড়ি ছাঁটার ব্যবস্থা করা হতো। এখন আর সেই যুগ নেই। গাজীপুরে একশত টাকা ঘরভাড়া দিয়ে বসবাস শুরু করেছি। এখন দুই হাজার টাকা ভাড়ায় বস্তিতে থাকি। একমাত্র ছেলে সাভারে গার্মেন্টে চাকরি করে। আগে পূজায় আসতো। তবে কয়েক বছর ধরে আর আসে না। শুনেছি বিয়ে করেছে। তবে তার কাছে আমার কিছুই চাওয়ার নাই। ‘বাবা নাপিত এ পরিচয় কি দেওয়া যায়।’ ভগবানের আশীর্বাদে বেঁচে আছি। তবে আমার বাপ-দাদারা নিজেকে নরসুন্দর বলে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দিতেন। তখন আমাদের জাতের সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। বহু বছর ধরে রাস্তার পাশে সরকারি জায়গায় কাঠের পিঁড়ি বিছিয়ে কাজ করি। তাও প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা দিতে হয়। ‘আগে মনে করতাম আমরাই সব চেয়ে নীচু জাতের। এখন দেখি আমাদের চেয়েও নীচু জাতের মানুষ আছে।’ হরিজন সম্প্রদায় : হিন্দু বা সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথাটির বৃষবৃক্ষ রোপণ করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল আর্যরা। তারপর বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী জাতপাতের বিভাজন করেণেই গেছেন। এ জাতপাতের বিভাজনে বেশ কয়েকটি সম্প্রদায়ের মানুষ সমাজে আজো অবহেলিত ও নিগৃহীত। জাতপাতের এ সংকট ভারত বর্ষের পর বাংলাদেশেও বহুকাল ধরে চলে আসছে। অথচ মহাত্মা গান্ধী দলিতদের মেথর, সুইপার না বলে ‘হরিজন’ বলার অমোঘ বাণী দিয়েছেন। একই দাবি জানিয়েছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বাংলাদেশে দলিত হরিজনরা এখনো মূল স্রোতের সঙ্গে মিশতে পারেনি। ফলে তারা বস্তিতে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছে। গাজীপুরে হরিজন গোত্রের সদস্যরা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরি করছেন। স্বল্প বেতনের চাকরিতে তাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়। তাই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগামী এ সময়ে হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষদের পেটে-ভাতে টিকে থাকাও দায়। তাই চাকরির পাশাপাশি ছুটির দিনেও সংসারের প্রয়োজন মেটাতে এ পেশায় নিয়োজিত অনেকেই বাসাবাড়িতে শৌচাগার পরিষ্কারের কাজ করছেন। এ সম্প্রদায়ের মানুষ সমাজে এতোটাই নিগৃহীত যে, তাদের কেউ বাসা ভাড়া দিতে চান না। তাই হরিজনরা তাদের সম্প্রদায়ের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে বহুকাল ধরে গাজীপুরে বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করে আসছেন। তবে শত লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা উপেক্ষা করে এ সম্প্রদায়ের লোকজন কালীপূজা ও দুর্গাপূজায় চাঁদা তুলে আনন্দ উৎসব করেন। এসব উৎসবে শামিল হন মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
হরিজন সম্প্রদায়ের চরণ মালিক জানান, তিনি স্বল্প বেতনে একটা গার্মেন্টে চাকরি করছেন। বিগত দিনে তিনি স্বাবলম্বী হওয়ার অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সুইপার বলে কোনো সংস্থা ক্ষুদ্রঋণও দেয় না। মেয়ে বিয়ের সময় পণ দিতে হবে। মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। বড় মেয়ে বিয়ের সময় অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম। অনেকেই দিয়েছে আবার অনেকেই সন্দেহ করেছে। নীচু জাতের মানুষদের কেউ বিশ্বাস করতে চান না। কোটিপতিদের কিছু হলে সবাই দৌড়ায়। অথচ আমাদের খবর কেউ রাখে না।
অবহেলিত মুচি-নরসুন্দর-হরিজন ও বেদেদের জীবনচিত্র
বেদে সম্প্রদায় : নৌকাই তাদের জীবন-জীবিকার সব। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, এক নগর থেকে অন্য নগরের নদী-খাল-বিলে এ যেন তাদের ক্ষুধা নিবারণের যাত্রা। বেদেরা সাপ ধরে খেলা দেখায়। সাপের বিষ বিক্রি করে। এ ছাড়াও তারা তাবিজ-কবচও বিক্রি করে। বিশেষ করে বছরে দুবার ফসল তোলার মৌসুমে ব্যবসার উদ্দেশে তারা বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে পরিভ্রমণ করে। এ পরিভ্রমণকে বেদে ভাষায় গাওয়াল বলে। বেদে সম্প্রদায়ের নারীরাই বেশি গাওয়ালে গিয়ে থাকে।
জানা গেছে, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে শরণার্থী আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে তারা ঢাকায় আসেন। পরবর্তী সময়ে তারা ইসলাম ধর্মে দীক্ষা নিয়ে প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করেন। পরে তারা সেখান থেকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বেদেরা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। এ ভাষার নাম ঠেট। তবে তারা বাংলা ভাষাতেও কথা বলতে পারে। বেদেরা এদেশের নাগরিক। তবে গাজীপুরে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ যুগযুগ ধরে নিগৃহীত হয়ে আসছে। কিন্তু বেদেরা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুসলমান সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। অভাব-অনটন আর অন্ধকারে আচ্ছন্ন বেদে সন্তানদের ভবিষ্য এক অনিশ্চিত পথের দিকে ছুটে চলছে।
তুরাগ নদীতে ভাসমান বেদে পল্লীর বাসিন্দা আমিরুন নেছা জানান, পঙ্গু স্বামীকে নিয়ে তিনি অর্ধহার-অনাহারে দিনপার করছেন। আগে সাপের খেলা দেখাতেন। কিন্তু এখন এ খেলা কেউ দেখতে চান না। রাস্তার পাশে পুলিশ বসতে দেয় না। কোনো দোকানের সামনেও বসতে দেয় না। ফেরি করে বাচ্চাদের খেলনা বিক্রি করি। আমাদের নিয়ে কেউ ভাবেন না। এ বেদেপল্লীতে হাজারো বেদে আছে। আমরা গাজীপুরের ভোটার। ‘ভোটের সময় এলে নেতারা হাতে-পায়ে ধরেন। মা বলে ডাকেন। ভোটের পর আর মায়ের খবর রাখেন না।’ এ বেদেপল্লীর শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। আশপাশে কোনো সরকারি স্কুল নেই। শিশুরা সারাদিন হইচই আর মারামারি করে। চল্লিশ বছর ধরে এ বেদেপল্লীতে আছি। কারো ভাগ্য পরিবর্তন হতে দেখিনি। অনেকেই আসে, ছবি তোলে। কিন্তু কিছুই দেয় না। ‘বিশ টাকা দে। পান কিনমু।’




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: আহসান হাবীব
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত খোলাকাগজ ২০১৬
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: বসতি হরাইজন এ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮/বি, হাউজ-২১, রোড-১৭, বনানী বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা-১২১৩।
ফোন : +৮৮-০২-৯৮২২০২১, ৯৮২২০২৯, ৯৮২২০৩২, ৯৮২২০৩৬, ৯৮২২০৩৭, ফ্যাক্স: ৯৮২১১৯৩, ই-মেইল : kholakagojnews@gmail.com
Developed & Maintenance by i2soft
var _Hasync= _Hasync|| []; _Hasync.push(['Histats.start', '1,3452539,4,6,200,40,00010101']); _Hasync.push(['Histats.fasi', '1']); _Hasync.push(['Histats.track_hits', '']); (function() { var hs = document.createElement('script'); hs.type = 'text/javascript'; hs.async = true; hs.src = ('//s10.histats.com/js15_as.js'); (document.getElementsByTagName('head')[0] || document.getElementsByTagName('body')[0]).appendChild(hs); })();